ম্যামোথ
বানান বিশ্লেষণ: ম্+য্+আ+ম্+ও+থ্+অ
উচ্চারণ:
mæ.mot̪ʰ (ম্যা.মোথ্)
শব্দ-উৎস:

তাতার mamont (ম্যামোন্ট)> তাতার mamont (ম্যামোন্ট)> রুশ mamot (ম্যামোট)> ইংরেজি mammoth>বাংলা ম্যামোথ।

পদ: বিশেষ্য
ঊর্ধ্বক্রমবাচকতা { | ম্যামোথ | প্রোবোস্‌সিডিয়ান | অমরাযুক্ত স্তন্যপায়ী | স্তন্যপায়ী | মেরুদণ্ডী | কর্ডেট | প্রাণী | জীবসত্তা | জীবন্তবস্তু | দৈহিক-লক্ষ্যবস্তু | দৈহিক সত্তা | সত্তা | }

অর্থ: বিলুপ্ত ম্যামুথুস (Mammuthus), গণের অন্তর্গত বিলুপ্ত প্রজাতিসমূহের সাধারণ নাম ম্যামোথ। উল্লেখ্য, ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ প্রাণী বিজ্ঞানী জোশুয়া ব্রুক্স (Joshua Brookes) এই ম্যামুথুস গণটির নামকরণ করেছিলেন।

ম্যামোথকে সাধারণভাবে বুঝানো হয়ে থাকে- লোমযুক্ত 'লোমশ হাতি' হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে সাইবেরিয়ান এবং উত্তর আমেরিকার ছাড়া অঞ্চলের ম্যামোথ ম্যামোথ ছাড়া অন্য ম্যমোথ গায়ে লোমশ ছিল না।

এদের সাধারণ দৈহিক রূপ বর্ণনায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়-
লম্বা এবং বাঁকানো গজদন্ত এবং শরীরের লম্বা ও ঘণ পশম। দেহকাণ্ড, পা, লেজ ইত্যাদির দিক থেকে ম্যামোথের সাথে বর্তমানকালের
হাতির খুব একটা পার্থক্য নেই।

১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে জার্মান বিজ্ঞানী জোহন ফ্রেড্রিখ ব্লুমেনব্যাক প্রথম ম্যামোথ সম্পর্কে আলোকপাত করেন। ইউরোপে প্রাপ্ত তখন তিনি এর নাম দিয়েছিলেন
Elephas primigenius। পরে অবশ্য একে ম্যামুথুস গণের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

ক্রমবিবর্তনের ধারায় ম্যামোথ
ট্রায়াসিক অধিযুগেরর ২২ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দে স্তন্যপায়ী শ্রেণির থেরিফর্ম্‌স্  উপশ্রেণির প্রাণিকুল থেকে হোলোথেরিয়া থাকের উদ্ভব হয়েছিল।
এরপর এই থাক থেকে ২১.৬৫ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দে উৎপন্ন হয়েছিল ট্রেকনোথেরিয়া থাক।

১৬.৫ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এই থাক থেকে উৎপন্ন হয়েছিল
ক্ল্যাডোথেরিয়া থাকের প্রাণিকুল। একই সময়ে ক্ল্যাডোথেরিয়া থাকের আদি প্রাণিকুল থেকে উদ্ভব হয়েছিল জাথেরিয়া থাক ও ড্রাইয়োলেসটোইডিয়া ঊর্ধবর্গের প্রাণিকুল। এই জাথেরিয়া থাক থেকে ১৬ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দে (জুরাসিক অধিযুগ) উৎপন্ন হয়েছিল থেরিয়া থাকের প্রাণিকুল। প্রায় একই সময়ে থেরিয়া থাক থেকে উদ্ভব হয়েছিল ইউথেরিয়া থাকের প্রাণিকুল। এই থাকের সর্ব প্রাচীন নমুনা স্তন্যপায়ী পাওয়া গেছে চীনে। এই প্রাণীটি এই থাকের জুরামিয়া গণের একটি প্রজাতি। এর বৈজ্ঞানিক নাম- Juramaia sinensis

ইউথেরিয়া থাক থেকে প্যালেয়োসিন যুগে (৬.৬-৫.৬ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) শুরুর দিকে অমরাযুক্ত (Placentalia) স্তন্যপায়ী প্রাণির আবির্ভাব ঘটে। জীববিজ্ঞানীরা এই জাতীয় স্তন্যপায়ীদের প্লাসেন্টালিয়া ক্ষুদ্রশ্রেণি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই ক্ষুদ্রশ্রেণি ৬.৬-৬.৫ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে দুটি বিভাজিত হয়ে যায়। এই ভাগ দুটি হলো- আট্‌লান্টোজেনাটা ও বোরেয়োইউথেরিয়া।

৬.৫ কোটি খ্রিষ্টাব্দের দিকে আট্‌লান্টোজেনাটা থাকের মূল ধারা থেকে আফ্রোথেরিয়া ঊর্ধবর্গের প্রজাতিসমূহের উদ্ভব হয়। অবশিষ্ট প্রজাতিগুলোকে জীববিজ্ঞানীরা এক্সাফ্রোপ্লাসেন্টালিয়া নামে অভিহিত করে থাকেন। আফ্রোথেরিয়া ঊর্ধবর্গের অধিকাংশের প্রজাতির প্রধান আবাস ছিল আফ্রিকার মাদাগাস্কার অঞ্চল।

এদের অধিকাংশই আকারে ছোট ছিল। বেশিরভাগ প্রজাতি স্থলচর ছিল, তবে কিছু প্রজাতি জলচরও ছিল। এদের দাঁত ছিল ক্ষুদ্রাকার, নাকের সম্মুখভাগ বর্ধিত ছিল। তবে কানের আকার অপেক্ষাকৃত বড় ছিল। অন্যদিকে শরীরের তুলনায় চোখের আকার ছিল বেশ ছোট। এদের হাতে পায়ে ছিল পাঁচটি আঙুল। এদের অধিকাংশ প্রজাতি পোকমাকড় খেতো। আবার কিছু প্রজাতি পোকামাকড়ের পাশাপাশি লতাপাতাও খেতো।
প্রায় ৬ কোটি খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দের দিকে এই ঊর্ধবর্গ দুটি থাকে ভাগ হয়ে যায়। এই থাক দুটি হলো- আফ্রোইনসেক্টিফিলা ও পিনুঙ্গুলাটা

৬ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ভিতরে পিনুঙ্গুলাট থাকের মূলধারা থেকে উদ্ভব হয় টেথিথেরিয়া থাক। ৬ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দ এই থাক বিভাজিত হতে শুরু করে। এই সূত্রে ৫.৫৮ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দে উদ্ভব হয়েছিল হাইরাকোডিয়া বর্গের প্রাণিকুল।

আবার ৬ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে মূল ধারার টেথিথেরিয়া থাক থেকে প্রোবোস্‌সিডিয়া বর্গের প্রজাতিসমূহের উদ্ভব হয়েছিল। ক্রমবিবর্তনের ধারায় এই বর্গের প্রাণিকুলের নিচের দাঁত বর্ধিত হয়ে গজদন্তে পরিণত হয়েছিল। এদের পা স্তম্ভের আকার ধারণ করেছিল। পায়ের পাতায় পাঁচটি আঙুল থাকলেও পুরু গোলাকার পেশির দ্বারা প্যাডের সৃষ্টি করেছিল। এছাড়া নাসিকার ক্রমবর্ধমান দশায় শুঁড় তৈরি হয়েছিল। খাদ্যের বিচারেও এরা পুরোপুরি তৃণভোজী হয়ে উঠেছিল। এরাই ছিল বর্তমান কালের হাতির আদিম-পুরুষ।

আদিকালের প্রোবোস্‌সিডিয়া বর্গের সকল প্রজাতিই আফ্রিকায় বাস করতো। ধারণা করা হয় মিয়োসিন অন্তঃযুগ (২.৩০৩-৫.৩৩৩ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)-এর শেষের দিকে এরা এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ছড়িয়ে পড়েছিল। কালের বিবর্তনে এই বর্গ থেকে উদ্ভব হয়েছিল অন্যান্য প্রজাতি। এখন পর্যন্ত এদের যেসকল জ্ঞাতিগোষ্ঠীর পরিচয় পাওয়া গেছে, সেগুলো হলো- এরিথেরিয়াম গণ, মোয়েরিথেরিডি গোত্র, প্লেইসিয়েলিফ্যান্টিফর্মস অধবর্গ ও এলিফ্যান্টিফর্‌ম্‌স্ অধবর্গ। এলিফ্যান্টিফর্‌ম্‌স্ অধঃবর্গের দুটি প্রজাতি বর্তমানে আফ্রিকা ও এশিয়াতে পাওয়া যায়। বাকি সকল সকল প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই অধিবর্গ যে সকল প্রাণিকুলের বিকাশ ঘটেছিল, সেগুলো হলো- প্যালিয়োমাস্টোডোন্টিডি গোত্র, ফিয়োমিয়া গোত্র, হেমিমাস্টোডোন্টিডি গোত্র এবং এলিফ্যান্টিমোর্ফা

ওলিগোসিন অন্তঃযুগ (৩.৩৯-২.৩০৩ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)-এর শেষের দিকে এলিফ্যান্টিফর্‌ম্‌স্ অধবর্গ থেকে উদ্ভব হয়েছিল  এলিফ্যান্টিমোর্ফা থাকের প্রাণীকুল। এই থাক থেকে ২.৮৪ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে মামুটিডা থাকের প্রাণিকুল পৃথক হয়ে গিয়েছিল। এই বিশেষ থাকের প্রজাতিগুলো প্রিবোরিয়াল আমল (১১,৭০০-৯০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)-এ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এলিফ্যান্টিফর্‌ম্‌স্ অধবর্গ থেকে ২.৩ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এলিফ্যান্টিডা থাকের প্রজাতির উদ্ভব হয়েছিল। আর এই থাক থেকে উদ্ভব হয়েছিল চারটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের প্রাণীকুল। এগুলো হলো-
কোয়েরোলোফোডোন্টিডি গোত্র, এমেবেলোডোন্টিডি গোত্র, গোমোফোথেরিডি গোত্র এবং এলিফ্যান্টোইডিয়া ঊর্ধ্ব-গোত্রের প্রাণিকুল। এর ভিতরে এলিফ্যান্টোইডিয়া ঊর্ধ্ব-গোত্রের প্রাণিকুল ছাড়া বাকি গোত্রের প্রজাতিসমূহ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এলিফ্যান্টোইডিয়া ঊর্ধ্ব-গোত্রের থেকে উদ্ভব হয়েছিল তিনটি গোত্রের প্রাণিকুল। এগুলো হলো- এ্যানানসিডি গোত্র, স্টেগোডোন্টিডি গোত্র এবং এলিফ্যান্টিডি গোত্র।

আবির্ভাবের সময়
প্লিয়োসিন অন্তঃযুগ (৫৩.৩৩-২.৫৮ লক্ষ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) এলিফ্যান্টিডি গোত্রের প্রাণিকুলের প্রজাতিগুলো থেকে উদ্ভব হয়েছিল পাঁচটি গণের প্রজাতিসমূহ। এই পাঁচটি গণ হলো- এলফাস, লোক্সোডোন্টা, প্যালিয়োক্সোডোন, পিরামেলেফাস এবং  ম্যামুথুস। উল্লেখ্য ম্যামুথুস গণের প্রজাতিকুল এশিয়ান হাতি তথা এলফাস গণের নিকটজ্ঞাতি। [দেখুন:  এলফাস, লোক্সোডোন্টা (হাতি) ]

প্লিয়োসিন অন্তঃযুগের ৫০ লক্ষ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে ম্যামুথুস গণের আবির্ভাব হয়েছিল এবং খ্রিষ্টপূর্ব ৩ হাজার ৭ শত অব্দের দিকে এই গণের সকল প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

প্রজাতিসমূহের সাধারণ নাম ম্যামোথ। এদের বিচরণ ক্ষেত্রে ছিল- এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকাতে। এখন পর্যন্ত এই গণের যে সকল প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে, তাদের পরিচয় তুলে ধরা হলো-

ম্যামোথদের প্রধান শত্রু ছিল। ইউরেশিয়ারে ম্যামোথদের  প্রাকৃতিক প্রতিকুলতা ছাড়াও প্রধান শত্রু ছিল নিয়ানডার্থাল এবং মানুষ (হোমো স্যাপিয়েন্স)। উভয় প্রজাতিই দলবদ্ধভাবে এদের শিকার করতো মাংসের জন্য। এছাড়া এদের শীত নিবারণের জন্য লোম ব্যবহার করতো। এদের অস্থি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতো। বিশেষ করে এদের দাঁত মূলবান শক্ত পদার্থ হিসেবে নানা কাজে ব্যবহৃত হত। ৪০ হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে হোমো নিয়ানডার্থালরা দীর্ঘ বাঁকানো দাঁত দিয়ে বাঁশি তৈরি করেছিল। ইউরোপের বিভিন্ন গুহাচিত্রে ম্যামোথদের উপস্থিতি রয়েছে। অর্থাৎ ম্যামোথরা সেকালের হোমো গণের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গিয়েছিল।


সূত্র: