বারীন মজুদার, পণ্ডিত (১৯১৯-২০০১ খ্রিষ্টাব্দ)
আগ্রা ঘরানার রাগসঙ্গীত শিল্পী ও পণ্ডিত।

১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই ফেব্রুয়ারি পাবনা শহরের রাধানগরে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা নিশেন্দ্র মজুমদার ছিলেন জমিদার এবং স্বনামধন্য অভিনেতা। তাঁর মা মণিমালা মজুমদার ছিলেন সেতারবাদক। মায়ের উৎসাহে তিনি সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। সঙ্গীতে তাঁর আগ্রহ দেখে, তাঁর পিতা তাঁকে রাগসঙ্গীতের তালিমের জন্য ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে পাঠান। এরপর তিনি দেশে ফিরে আসেন।

এর কিছুদিন পরে সঙ্গীতে উচ্চতর শিক্ষার জন্য তাই তিনি লক্ষ্মৌ যান। সেখানে প্রথমেই তাঁর সাথে পরিচয় হয় ওস্তাদ উদয় শংকর ও রবি শংকরের সঙ্গে। সেখানে তাঁর সাথে পরিচয় ঘটে চিন্ময় লাহিড়ির সাথে। লক্ষ্মৌতে তিনি মরিস কলেজ অব মিউজিকে ভর্তি হন। এই সময় তিনি লক্ষ্মৌয়ের ওস্তাদ রঘুনন্দন গোস্বামীর নিকটও সঙ্গীত শিক্ষা লাভ করেন। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিমিউজ পাশ করেন।
এরপর ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি পণ্ডিত শ্রীকৃষ্ণ রতনজনকর, অধ্যাপক জে এন নান্টু, ওস্তাদ হামিদ হোসেন খাঁ, চিন্ময় লাহিড়ী, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ ও ওস্তাদ খুরশীদ আলী খাঁর কাছে স্বতন্ত্রভাবে তালিম নেন।

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পাক-ভারত বিভাজনের পর তিনি, তদানীন্তন পূর্ব-পাকিস্তানে চলে আসেন। এ সময় অর্থসংকটে পড়ে তাঁর পরিবার। জীবিকার প্রয়োজনে একসময় ফটোগ্রাফি কাজ শুরু করেন।
১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে উচ্চাঙ্গ সংগীতের অধ্যক্ষ হিসেবে বুলবুল একাডেমীতে যোগ দেন। এখানে তিনি প্রথাসিদ্ধ ধ্রুপদী সংগীত চর্চার কোর্স চালু করেন। এ সময়ে তিনি ঢাকা বোর্ডের সঙ্গীত সিলেবাস প্রণয়ন করেন এবং ঢাকা রেডিওতে বিশেষ শ্রেণীর শিল্পী হিসেবে রাগসঙ্গীত পরিবেশন শুরু করেন।
১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে 'কলেজ অব মিউজিক' পূর্ব-পাকিস্তানে দেশের প্রথম সংগীত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৬ জন শিক্ষক ও ১১ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে এই কলেজের যাত্রা শুরু হয়। 

১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বেতারের অডিশন ও গ্রেডেশন বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। অবশ্য এর অনেক আগে থেকেই তিনি বিশেষ শ্রেণীর রাগ সংগীতশিল্পী ছিলেন ঢাকা বেতারের। ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ওস্তাদ বারীণ মজুমদার 'মণিহার সঙ্গীত একাডেমী' প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় তিনি সঙ্গীতের পাঠ্যপুস্তক 'সঙ্গীতকলি' ও 'সুর লহরী' প্রণয়ন করেন।

২০০১ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা অক্টোবর ঢাকার হলিফ্যামিলি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

ব্যাক্তিগত জীবনে পণ্ডিত বারীন মজুমদার বিশিষ্ট ধ্রুপদী সংগীতশিল্পী ইলা মজুমদারকে বিবাহ করেন। তিনি ছিলেন দুই পুত্রের জনক। এঁরা হলেন পার্থ মজুমদার (সঙ্গীত পরিচালক) এবং বাপ্পা মজুমদারের (সঙ্গীত পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পী)।

সঙ্গীত চর্চায় ও সঙ্গীত শিক্ষায় অসামান্য ও গৌরবোজ্জ্বল অবদানের জন্য প্রয়াত ওস্তাদ বারীন মজুমদার পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের খেতাব 'তমঘা-ই-ইমতিয়াজ' লাভ করেন তিনি।

১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে বেগম জেবুন্নেসা ও কাজী মাহবুবউল্লা ট্রাস্ট পুরস্কার পান
১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে ছায়ানট তাঁকে সিধু ভাই পুরস্কার দেয়।
১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে পাবনা পদক পান।
১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে জনকণ্ঠ গুণীজন সম্মাননা পদক পান।
১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমী ফেলোশিপ অর্জন করেন।
২০০২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়।


সূত্র :