গাউছুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী
মাইজভাণ্ডারী তরিকার
প্রতিষ্ঠাতা।
১৮২৬-১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দ
১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ জানুয়ারি (১ম মাঘ, ১২৩৩ বঙ্গাব্দ) চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার মাইজভাণ্ডার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ মতিউল্লাহ মাইজভাণ্ডারী এবং মাতা সৈয়দা খায়রুন্নেছা ছিলেন ধার্মিক ও আধ্যাত্মিক পরিবারের সদস্য।
কথিত আছে তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন সৈয়দ বংশের। এঁরা মদিনা থেকে বাগদাদ, দিল্লি এবং গৌড় (প্রাচীন বাংলার রাজধানী) হয়ে চট্টগ্রামে আসেন।
তাঁর প্র-প্রপিতামহ সৈয়দ হামিদ উদ্দিন ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারের জন্য
বসবাস শুরু করেন।
পারিবারিক সূত্রে বাল্যকাল থেকে আহমদুল্লাহ কুরআন, হাদিস এবং ইসলামী শাস্ত্রে পারদর্শী হয়ে
ওঠেন। গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা নেওয়ার পর কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসায় উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন।
এখানে তিনি আরবি, ফার্সি, উর্দু ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। এছাড়া হাদিস, তাফসির, ফিকহ, মানতিক, হিকমত, বালাগত, উশুল, আকায়েদ, ফিলসফা এবং ফারায়েজ
বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাঁর পীরে তরিকত ছিলেন হযরত সৈয়দ আমিনুল হক মাইজভাণ্ডারী এবং পীরে বায়াত ছিলেন হযরত সৈয়দ গোলাম আলম। ১৮৫৭
খ্রিষ্টাব্দে তিনি পীরের নির্দেশে মাইজভাণ্ডারে ফিরে আসেন এবং আধ্যাত্মিক সাধনা শুরু করেন। এখানে জিকির, হালকা (আধ্যাত্মিক নৃত্য) এবং দোয়া-প্রার্থনার মাধ্যমে তাঁর কামালিয়ত (আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতা) প্রকাশ পায়। তাঁর বাসগৃহ দ্রুত একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে পরিণত হয়, যা পরে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ নামে পরিচিত হয়।
কুরআন ও হাদিস ভিত্তিক এবং সহজসাধ্য সাধনার উপর ভিত্তি করে তিনি আজম মাইজভাণ্ডারী তরিকা প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি তাঁর ধর্ম দর্শন চর্চার সাতটি ধাপ নির্ধারণ করেন। তিনি মনে করতেন এই সাতটি ধাপ-
মানুষের নফসের কুপ্রবৃত্তি দমন করে রূহের সুপ্রবৃত্তিকে জাগরিত করে। এই
সপ্তধাপগুলো হলো-
১. তাওবা (অনুতাপ): পাপের জন্য আন্তরিক অনুতাপ ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা।
- সাধনা:
সাধককে তাঁর অতীতের ভুল ও পাপের জন্য অনুতাপ করতে হয় এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসার দৃঢ় সংকল্প নিতে হয়। এটি আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রথম ধাপ, যা হৃদয়কে পবিত্র করে।
- মাইজভাণ্ডারী প্রেক্ষাপট: তাওবা হলো নফসের দাসত্ব থেকে মুক্তি এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন। এটি জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে শক্তিশালী হয়।
২. জিকির (আল্লাহর স্মরণ): আল্লাহর নাম ও গুণাবলির স্মরণ, মন ও হৃদয়কে আল্লাহর প্রতি কেন্দ্রীভূত করা।
- সাধনা: নির্দিষ্ট জিকির (যেমন "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ", "আল্লাহু", "হু") উচ্চারণের মাধ্যমে সাধক হৃদয়ে ঐশ্বরিক সান্নিধ্য অনুভব করেন। মাইজভাণ্ডারী তরিকায় জিকির ব্যক্তিগত ও সমবেত উভয়ভাবে করা হয়।
- মাইজভাণ্ডারী প্রেক্ষাপট: জিকির হলো আত্মার খাদ্য। হযরত গাউছুল আজম জোর দিয়েছিলেন যে, জিকিরের মাধ্যমে সাধক নিজেকে দুনিয়ার মায়া থেকে মুক্ত করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেন।
৩. হালকা (আধ্যাত্মিক নৃত্য): আল্লাহর প্রেমে উদ্বেল হয়ে সাধনার সময় শরীরের স্বতঃস্ফূর্ত নড়াচড়া বা নৃত্য।
- সাধনা: হালকা মাইজভাণ্ডারী তরিকার একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অংশ, যেখানে জিকিরের সাথে সাধকরা সুর ও তালের মাধ্যমে ভক্তির আনন্দে নিমগ্ন হন। এটি সমবেতভাবে মাইজভাণ্ডার শরীফে বা অন্যান্য আধ্যাত্মিক আসরে সম্পন্ন হয়।
- মাইজভাণ্ডারী প্রেক্ষাপট: হালকা হৃদয়ের উচ্ছ্বাস ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ। এটি মাইজভাণ্ডারী গানের সাথে সংযুক্ত, যা ভক্তদের মধ্যে ঐশ্বরিক অনুভূতি জাগায়।
৪. মুরাকাবা (ধ্যান): আল্লাহর সান্নিধ্যে মনকে একাগ্র করে ধ্যান করা।
- সাধনা: সাধক নির্জন পরিবেশে বা নির্দিষ্ট সময়ে আল্লাহর গুণাবলি, তাঁর সৃষ্টি বা নিজের আত্মার উপর চিন্তা করেন। এটি হৃদয়কে শান্ত করে এবং আধ্যাত্মিক গভীরতা বাড়ায়।
- মাইজভাণ্ডারী প্রেক্ষাপট: মুরাকাবা সাধককে নিজের ভেতরের দিকে তাকাতে শেখায়, যা নফসের দমন ও আল্লাহর সঙ্গে মিলনের পথ প্রশস্ত করে।
৫. মুহাব্বত (ঐশ্বরিক প্রেম): আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও ভক্তি।
- সাধনা: সাধককে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁদের শিক্ষা অনুসরণের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করতে হয়। এটি মানবতার প্রতি প্রেম ও সহানুভূতির প্রকাশ ঘটায়।
- মাইজভাণ্ডারী প্রেক্ষাপট: হযরত গাউছুল আজম শিখিয়েছেন যে, মুহাব্বতই তরিকার প্রাণ। এটি মাইজভাণ্ডারী গানের মূল থিম, যেখানে প্রকৃতি, মানুষ ও আল্লাহর প্রতি প্রেমের কথা ব্যক্ত হয়।
৬. মুজাহিদা (আত্মশুদ্ধি): নফসের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও আত্মশুদ্ধি।
- সাধনা: সাধককে লোভ, ক্রোধ, হিংসা, অহংকারের মতো নেতিবাচক প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়। এটি কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সৎ জীবনযাপনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
- মাইজভাণ্ডারী প্রেক্ষাপট: মুজাহিদা হলো নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ, যা সাধককে আল্লাহর পথে আরও কাছে নিয়ে যায়। এটি তরিকার কঠিনতম ধাপগুলোর একটি।
৭. ফানা ফিল্লাহ (আল্লাহর মধ্যে বিলীন হওয়া): নিজের অহং ও ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করে তাঁর মধ্যে বিলীন হওয়া।
- সাধনা: এটি সাধনার চূড়ান্ত ধাপ, যেখানে সাধক নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর প্রতি সমর্পণ করেন। এই অবস্থায় সাধক আল্লাহর সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেন এবং দুনিয়ার মায়া থেকে মুক্ত হন।
- মাইজভাণ্ডারী প্রেক্ষাপট: ফানা ফিল্লাহ হলো মাইজভাণ্ডারী তরিকার চরম লক্ষ্য। হযরত গাউছুল আজম শিখিয়েছেন যে, এই ধাপে পৌঁছানোর জন্য পূর্বের ছয়টি ধাপ পার করা অপরিহার্য।
তিনি ধর্মাচরণের অঙ্গ
হিসেবে গান অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর তরিকা অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী এবং প্রকৃতি-প্রেমময়, যা বাংলার লোকসংগীতের সাথে মিশে
মাইজভাণ্ডারী গানের উদ্ভব হয়
জীবনের শেষভাগে তিনি তাঁর খিলাফত (উত্তরসূরি) নির্ধারণ করেন। এক জুমার দিন এলাকার সমাজপতি ও জনগণের উপস্থিতিতে তাঁর পুত্র
হযরত
সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারী (রহ.) গদী অর্পণ করেন। ১৯০৬ সালের ২৩ জানুয়ারি (১০ মাঘ, ১৩১২ বঙ্গাব্দ) মাইজভাণ্ডারে
মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মাজার শরীফ মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে অবস্থিত, যা আজও লক্ষাধিক ভক্তের তীর্থস্থান। প্রতি বছর তাঁর ওরশ উপলক্ষে গিলাফ চড়ানো এবং আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠান হয়।