জালাল উদ্দিন খাঁ
১৮৯৪-১৯৭২
বিশিষ্ট বাউল কবি ও গায়ক।
দেখুন: জালালউদ্দীন খাঁ-এর গানের সংকলন

১৮৯৪ সালে ২৫ এপ্রিল নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার আসদহাটি গ্রামে তাঁর মাতুলায়ে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম সদরুদ্দীন খাঁ। মায়ের নাম মোখলেসজান।  জালাল উদ্দিন খাঁ ছিলেন পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান। শৈশবে কলেরায় তাঁর অন্যান্য ৫ ভাইয়ের মৃত্যু ঘটেছিল। সন্তানাদি হারানোর দুঃখে জালালের পিতা সংসার বিবাগী হয়ে যান। ফলে তিনি মাতুলালয়ে বড় হয়ে ওঠেন। এই গ্রামের পাঠশালায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু হয়।

এরপর নেত্রকোণা শহরের ক্লাকার মাদ্রাসা মিডল মাদ্রাসাতে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ। বর্তমান এই মাদ্রাসার নাম আঞ্জুমান আদর্শ সরকারী উচ্চবিদ্যালয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ সমাপ্ত করে তিনি নেত্রকোণা দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে (১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দ) মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। পরে তিনি কেন্দুয়া জয়হরি স্প্রাই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে (স্থাপিত ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দ) ভর্তি হন। এই স্কুলে দশম শ্রেণিতে পাঠগ্রহণকালেই বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। এরপর তিনি আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন নাই।

এঁদের নিবাসে জালালউদ্দীনের ছয় ভাই কলেরায় মৃত্যবরণ করেন। এরপর তিনি এই আদি পৈত্রিক বাড়ি ত্যাগ করে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে
সিংহেরগাঁওয়ে চলে যান। পরবর্তী জীবন তিনি এই গ্রামেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেছিলেন।

এরপর তিনি সিংহেরগাঁওয়ের তাঁর মায়ের ফুফাত ভাই হাসমত তালুকদারের একমাত্র কন্যা ইয়াকুতুন্নেসাকে বিবাহ করেন। এই সময় ভারতবর্ষ জুড়ে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হলে- তিনি স্বদেশী দলে যোগ দেন। ফলে তাঁর আর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার সুযোগ ঘটে নি।

১৯২ খ্রিষ্টাব্দের (১৩২বঙ্গাব্দ) দিকে এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রেখে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তিনি সংসার বিবাগী হয়ে বিভিন্ন সাধু-দরবেশদের সাথে দেশব্যাপী ভ্রমণ করেন এবং তাঁদের আস্তানায় কাটান। গোড়ার দিকে তিনি নানা ধর্মদরশনে আকৃষ্ট হন। পড়ে সুফি দর্শনের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত হয়ে ওঠেন। এরই ভিতরে এক হিন্দু সন্ন্যাসীর সংস্পর্শে এসে তিনি শাক্ত ও বৈষ্ণব দর্শনের সাথে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এবং সন্ন্যাসীর অনুপ্রেরণায় সঙ্গীতের মাধ্যমে নিজের ভাবনাকে প্রকাশ করার উৎসাহী হয়ে ওঠেন। এরপর থেকে তিনি গান লেখা এবং গাওয়া শুরু করেন। সঙ্গীতের সূত্রে তিনি পরিচত হন বাউল গান এবং বাউল দর্শনের সাথে। পরবর্তী জীবনে তাঁর সঙ্গীতে বাউল দর্শনের ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল।

পরে তিনি বাড়ির কাছেই মদনপুর গ্রামের শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমীর মাজারে। এখানে তিনি সুফিবাদী দর্শনের সাধক হয়ে ওঠেন।

জালালউদ্দীনের গান পাঠ করে এই গানের প্রতি বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে উঠেন শিল্পী আব্বাস উদ্দীন। পরে তাঁর সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল জালাল উদ্দীন খাঁয়ের। আব্বাস উদ্দীনি জাললাগীতিকা  পাঠক করে মুগ্ধ হন এব ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ মার্চ একটি চিঠিতে এই মুগ্ধতার কথা জালাল উদ্দীন খাঁকে জানান।


তাঁর জীবদ্দশায় চার খণ্ডের 'জালাল-গীতিকা' গ্রন্থে ৬৩০টি গান প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় এই গ্রন্থের পঞ্চম খণ্ড। নতুন খণ্ডে যুক্ত যুক্ত হয়েছিল নতুন ৭২টি গান। ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে মার্চে যতীন সরকারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল জালাল গীতিকা সমগ্র। এত গানের সংখ্যা ছিল ৭০২টি।

জালাল উদ্দীন খাঁ গান রচনায় বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন রশিদ উদ্দীনের দ্বারা। অনেকে মনে করেন যে, তিনি রশিদ উদ্দীনের প্রত্যক্ষ শিষ্য ছিলেন। মূলতপক্ষে  তিনি ছিলেন রশিদ উদ্দীনের ভাবশিষ্য।

জালাল খান তাঁর গানগুলোকে বিভিন্ন 'তত্ত্ব' অনুসারে তে বিন্যস্ত করেছিলেন। এই তত্ত্বগুলোর হলো- আত্মতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব, নিগূঢ় তত্ত্ব, লোকতত্ত্ব, দেশতত্ত্ব, বিরহতত্ত্ব। এর বাইরেও তিনি কিছু গান রেখেছিলেন, যেগুলোকে কোনো তত্ত্বের অন্তর্ভুক্ত করেন নি। জালাল গীতিকার খণ্ড অনুসারে যে বিষয়বিন্যাস পাওয়া যায়, তা হলো- সঙ্গীতের বাইরে তিনি রচনা করেছিলেন -বিশ্ব রহস্য নামক প্রবন্ধ গ্রন্থ।

১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১ আগষ্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
[জালাল উদ্দিন খাঁ-এর গানের তালিকা]