শেখ ভানু
১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দ (১২৫৮ বঙ্গাব্দ) -১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দ (১৩২৬ বঙ্গাব্দ)।
প্রখ্যাত মরমী কবি,সাধক ও বাউল।

১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে শেখ ভানু বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার বামৈ ইউনিয়নের ভাদিকারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মুনশি নাসিরউদ্দিন। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। শেখ ভানুর বাবা হবিগঞ্জ সদর উপজেলার উচাইল গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। পরে লাখাইয়ের ভাদিকারা গ্রামে বসবাস শুরু করেন। নাসিরউদ্দীন গ্রামের মক্তব ও মসজিদে ইমামতি করতেন। নাসিরউদ্দিন তাঁর বাড়িতে পাক-পাঞ্জাতন (হোসেনি ঘর) স্থাপন করেন।

সংসারের অসচ্ছলতার জন্য শেখ ভানু তার বাবাকে সহযোগিতা করার জন্য ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। তিনি সিলেট ও ছাতক থেকে পাইকারি দরে কমলা কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতেন। ফলের ব্যবসার সুবাদেই ভৈরব বাজারের কিছু ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে।

যুবক বয়সে তাঁদের পরামর্শে তিনি বিভিন্ন গ্রামের গৃহস্থদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে ভৈরব বাজারে বড় বড় মহাজনদেরকে ধান সরবরাহ করে কমিশন পেতেন। কিছুদিনের মধ্যে ব্যবসায় সুনাম অর্জন করেন এবং ধীরে ধীরে তিনি ‘ভানু ব্যাপারী’ নামে সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এক সময় তিনি নিজ গ্রামের মেয়ে সার বানুর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু তাদের সংসারে কোনো সন্তান না হওয়ায় তিনি বামৈ গ্রামের জুলেখা বিবির সাথে দ্বিতীয় সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। অবশেষে তিনি দ্বিতীয় সংসারেও সন্তানের মুখ দেখতে পান নি। শেখ ভানু একদিন ব্যবসা-সংক্রান্ত কাজে নদীপথে নৌকা করে ভৈরব বাজারে যাওয়ার সময় কান্‌লারবাগ নামের একটি স্থানে তিনি লক্ষ্য করেন- নদী দিয়ে ভেসে চলা একজন মানুষের মৃতদেহ ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে কয়েকটি কাক। পাশেই ঘেউ ঘেউ করছিল কয়েকটি কুকুর। এ দৃশ্য দেখার পর তার মনের মধ্যে মৃত্যুচিন্তা প্রকটভাবে ভর করে। শেখ ভানু ভাবেন-

মুরদা মানুষ এক ভাসে দরিয়ায়
উপরে বসিয়া কাকে চক্ষু তার খায়
মাছ-মাছালি টাইনে খায় জলের উপরে
সোনার তনু জলে ভাসে কোথায় গেল দম।

এরপর তাৎক্ষণিক নৌকার অন্যদের সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ি ফেরেন শেখ ভানু। অনেকটা ঘোরের মধ্যেই কিছুদিন কাটে তার। এ সময় শেখ ভানু সুফিবাদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য বাগদাদ থেকে বাংলাদেশে আগত দরবেশ মীরান শাহের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। যার বয়ান 'আশরারুল এশক' গ্রন্থে তিনি ত্রিপদি ছন্দে উল্লেখ্য করেছেন-

মুর্শিদ মোর মীরাণ শাহা,         মরি মরি আহা আহা
              কি কহিমু গুণের বাখানী।
বড়পীর বোগদাদেরই,              বহুত দিন খাদেম করি
              দেশে দেশে করিলেন ছফর।
(একদিন) গরিব খানাতে আসি,   জাগিয়া পোহাইলেন নিশি
             নছিয়ত করিলেন বহুতর।
মুরিদ করিয়া মোরে,         চলিয়া গেলেন ঘরে
           রাখিয়া আমারে একাশ্বর।
দেশে দেশে আছে জারী,     তাতার মুল্লুক হয় বাড়ী
          জন্ম আদি সৈয়দ খান্দান।

এরপর তিনি ধীরে ধীরে প্রবেশ করেন মরমী গানের জগতে। এই আদর্শ অনুসরণে তিনি একের পর এক গজল, মুর্শিদি, দেহতত্ত্ব, মনশিক্ষা, নিগূঢ়তত্ত্ব, আত্মতত্ত্ব, বাউলগান, বিচ্ছেদ, কাওয়ালি, বৈষ্ণব পদাবলি ও বারোমাসি পর্যায়ভুক্ত গান রচনা করতে থাকেন। তার লিখা গানের সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি।

শেখ ভানুর অসংখ্য গানের মধ্যে জনপ্রিয় গানগুলো হচ্ছে,

১. আমি পাড়লাম না-রে আমার মনকে বুঝাইতে
২.  নিশিতে যাইও ফুল বনে।

১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে মনসুর উদ্দীন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কয়েক হাজার বাউল গান সংগ্রহ করেন। এই গানগুলো 'হারামণি' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।  এই কবিকে নিয়ে সৈয়দ মোস্তফা কামাল, দেওয়ান নুরুল আনোয়ার চৌধুরী, ডঃ আসরাফ সিদ্দিকী, মোস্তফা জামান আব্বাসী, নন্দলাল শর্মা, তরফদার মোহাম্মদ ইসমাইলের মতো গুণিজনেরা গবেষণা করেছেন। 'সুফী দার্শনিক কবি শেখ ভানু' শিরোনামে একটি গ্রন্থ ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়।

১৩২৬ বঙ্গাব্দের ৩ কার্তিক  (সোমবার, ২০ অক্টোবর ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি মৃত্যুবরণ করেন।


[শেখ ভানুর রচিত গানের তালিকা]
[শেখ ভানুর গানের শ্রেণিকরণ]

তথ্যসূত্র
  • সিলেটের মরমী মানস। সম্পাদক সৈয়দ মোস্তফা কামাল।  প্রকাশনা: মহাকবি সৈয়দ সুলতান সাহিত্য ও গবেষণা পরিষদ, প্রকাশ। ২০০৯।
  • সিলেটের আঞ্চলিক গান 'শেখ ভানু প্রবন্ধ'।  মোহাম্মদ খালেদ মিয়া। প্রকাশক: সাইদুর রহমান, মে  ২০০৫।
  • বাউল-ফকির পদাবলি শেখ ভানু। সুমনকুমার দাশ। প্রকাশক: মোঃ শাহাদাত হোসেন।  ২০১৭।
  • শেখ ভানু শাহ'র কালাম ও বিশ্লেষণ। মোঃ বদিউল আলম। ২০১১।