বঙ্কিম-রচনাবলী

দেবী চৌধুরাণী
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

দ্বিতীয় খণ্ড
সপ্তম পরিচ্ছেদ


    ব্রজেশ্বর কিয়ৎক্ষণ বিহ্বল হইয়া রহিল। শেষে জিজ্ঞাসা করিল, “সাগর! তুমি এখানে কেন?” সাগর বলিল, “সাগরের স্বামী! তুমিই বা এখানে কেন?”
    ব্র। তাই কি? আমি কয়েদী, তুমিও কি কয়েদী? আমাকে ধরিয়া আনিয়াছে। তোমাকেও কি ধরিয়া আনিয়াছে?
    সাগর। আমি কয়েদী নই, আমাকে কেহ ধরিয়া আনে নাই। আমি ইচ্ছাক্রমে দেবী রাণীর সাহায্য লইয়াছি। তোমাকে দিয়া আমার পা টিপাইব বলিয়া দেবী রাণীর রাজ্যে বাস করিতেছি।
    তখন নিশি আসিল। ব্রজেশ্বর তাহার বস্ত্রালঙ্কারের জাঁকজমক দেখিয়া মনে করিল, “এই দেবী চৌধুরাণী”। ব্রজেশ্বর সম্ভ্রম রাখিবার জন্য উঠিয়া দাঁড়াইল। নিশি বলিল, “স্ত্রীলোক ডাকাইত হইলেও তাহার অত সম্মান করিতে নাই–আপনি বসুন। এখন শুনিলেন, কেন আপনার বজরায় আমরা ডাকাইতি করিয়াছি? এখন সাগরের পণ উদ্ধার হইয়াছে; এখন আপনাতে আর আমাদের প্রয়োজন নাই, আপনি আপনার নৌকায় ফিরিয়া যাইলে কেহ আটক করিবে না। আপনার জিনিসপত্র এক কপর্দক কেহ লইবে না, সব আপনার বজরায় ফিরিয়া পাঠাইয়া দিতেছি। কিন্তু এই একটা কপর্দক–এই পোড়ারমুখী সাগর, ইহার কি হইবে? এ কি বাপের বাড়ী ফিরিয়া যাইবে? ইহাকে আপনি লইয়া যাইবেন কি? মনে করুন, আপনি উহার এক কড়ার কেনা গোলাম।”
    বিস্ময়ের উপর বিস্ময়! ব্রজেশ্বর বিহ্বল হইল। তবে ডাকাইতি সব মিথ্যা, এরা ডাকাইত নয়! ব্রজেশ্বর ক্ষণেক ভাবিল, ভাবিয়া শেষে বলিল, “তোমরা আমায় বোকা বানাইলে। আমি মনে করিয়াছিলাম, দেবী চৌধুরাণীর দলে আমার বজরায় ডাকাইতি করিয়াছে।”
    তখন নিশি বলিল, “সত্যসত্যই দেবী চৌধুরাণীর এই বজরা। দেবী রাণী সত্যসত্যই ডাকাইতি করেন”,–কথা শেষ হইতে না হইতেই ব্রজেশ্বর বলিল, “দেবী রাণী সত্যসত্যই ডাকাইতি করেন–তবে আপনি কি দেবী রাণী নন?”
    নি। আমি দেবী নই। আপনি যদি রাণীজিকে দেখিতে চান, তিনি দর্শন দিলেও দিতে পারেন। কিন্তু যা বলিতেছিলাম, তা আগে শুনুন। আমরা সত্য সত্যই ডাকাইতি করি, কিন্তু আপনার উপর ডাকাইতি করিবার আর কোন উদ্দেশ্য নাই, কেবল সাগরের প্রতিজ্ঞা রক্ষা। এখন সাগর বাড়ী যায় কি প্রকারে? প্রতিজ্ঞা ত রক্ষা হইল।
    ব্র। আসিল কি প্রকারে?
    নি। রাণীজির সঙ্গে।
    ব্র। আমিও ত সাগরের পিত্রালয়ে গিয়াছিলাম–সেখান হইতেই আসিতেছি। কই, সেখানে ত রাণীজিকে দেখি নাই?
    নি। রাণীজি আপনার পরে সেখানে গিয়াছিলেন।
    ‍ ‍ব্র। তবে ইহার মধ্যে এখানে আসিলেন কি প্রকারে?
    নি। আমাদের ছিপ দেখিয়াছেন ত? পঞ্চাশ বোটে।
    ব্র। তবে আপনারাই কেন ছিপে করিয়া সাগরকে রাখিয়া আসুন না?
    নি। তাতে একটু বাধা আছে। সাগর কাহাকে না বলিয়া রাণীর সঙ্গে আসিয়াছে–এজন্য অন্য লোকের সঙ্গে ফিরিয়া গেলে, সবাই জিজ্ঞাসা করিবে, কোথায় গিয়াছিলে? আপনার সঙ্গে ফিরিয়া গেলে উত্তরের ভাবনা নাই।
    ব্র। ভাল, তাই হইবে। আপনি অনুগ্রহ করিয়া ছিপ হুকুম করিয়া দিন।
    “দিতেছি” বলিয়া নিশি সেখান হইতে সরিয়া গেল। তখন সাগরকে নির্জনে পাইয়া ব্রজেশ্বর বলিল, “সাগর! তুমি কেন এমন প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলে?”
    মুখে অঞ্চল দিয়া–এবার ঢাকাই রুমাল নহে–কাপড়ের যেখানটা হাতে উঠিল, সেইখানটা মুখে ঢাকা দিয়া সাগর কাঁদিল–সেই মুখরা সাগর টিপিয়া টিপিয়া, কাঁপিয়া কাঁপিয়া চুপি চুপি ভারি কান্না কাঁদিল। চুপি চুপি–পাছে দেবী শোনে।
    কান্না থামিলে ব্রজেশ্বর জিজ্ঞাসা করিল, “সাগর! তুমি আমায় ডাকিলে না কেন? ডাকিলেই সব মিটিয়া যাইত।”
    সাগর কষ্টে রোদন সংবরণ করিয়া, চক্ষু মুছিয়া বলিল, “কপালের ভোগ, কিন্তু আমি নাই ডাকিয়াছি–তুমিই বা আসিলে না কেন?”
    ব্র। তুমি আমায় তাড়াইয়া দিয়াছিলে –না ডাকিলে যাই কি বলিয়া?
    এই সকল কথাবার্তা যথাশাস্ত্র সমাপন হইলে ব্রজেশ্বর বলিল, “সাগর! তুমি ডাকাইতের সঙ্গে কেন আসিলে?”
    সাগর বলিল, “দেবী–সম্বন্ধে আমার ভগিনী হয়, পূর্বে জানাশুনা ছিল। তুমি চলিয়া আসিলে, সে গিয়া আমার বাপের বাড়ী উপস্থিত হইল। আমি কাঁদিতেছি দেখিয়া সে বলিল, কাঁদ কেন ভাই–তোমার শ্যামচাঁদকে আমি বেঁধে এনে দিব। আমার সঙ্গে দুই দিনের তরে এসো।’ তাই আমি আসিলাম। দেবীকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করিবার আমার বিশেষ কারণ আছে। তোমার সঙ্গে আমি পলাইয়া চলিলাম, এই কথা আমি চাকরাণীকে বলিয়া আসিয়াছি। তোমার জন্য এই সব আলবোলা, সট্কা প্রভৃতি সাজাইয়া রাখিয়াছি–একবার তামাক-টামাক খাও, তার পর যেও।”
    ব্রজেশ্বর বলিলেন, “কই, যে মালিক, সে ত কিছু বলে না।”
    নিশিকে দেখিয়া ব্রজেশ্বর বলিল, “এখন আপনি ছিপ হুকুম করিলেই যাই।”
    নি। ছিপ তোমারই। কিন্তু দেখ, তুমি রাণীর বোনাই–কুটুম্বকে স্বস্থানে পাইয়া আমরা আদর করিলাম না–কেবল অপমানই করিলাম, এ বড় দুঃখ থাকে। আমরা ডাকাইত বলিয়া আমাদের কি হিন্দুয়ানি নাই?
    ব্র। কি করিতে বলেন?
    নি। প্রথমে উঠিয়া ভাল হইয়া বসো।
    নিশি মসনদ দেখাইয়া দিল। ব্রজেশ্বর শুধু গালিচায় বসিয়াছিল। বলিল, “কেন আমি বেশ বসিয়া আছি।”
    তখন নিশি সাগরকে বলিল, “ভাই তোমার সামগ্রী তুমি তুলিয়া বসাও। জান, আমরা পরের দ্রব্য ছুঁই না।” হাসিয়া বলিল, “সোণা রূপা ছাড়া।”
    ব্র। তবে আমি কি পিতল-কাঁসার দলে পড়িলাম।
    নিশি। আমি ত তা মনে করি–পুরুষমানুষ স্ত্রীলোকের তৈজসের মধ্যে। না থাকিলে ঘর-সংসার চলে না–তাই রাখিতে হয়। কথায় কথায় সকড়ি হয়–মাজিয়া ঘষিয়া ধুইয়া ঘরে তুলিতে নিত্য প্রাণ বহিয়া যায়। নে ভাই সাগর, তোর ঘটি-বাটি তফাৎ কর–কি জানি, যদি সকড়ি হয়।
    ব্র। একে ত পিতল কাঁসা–তার মধ্যে আবার ঘটি বাটি! ঘড়াটা গাড়ুটার মধ্যে গণ্য হইবারও যোগ্য নই?
    নি। আমি ভাই বৈষ্ণবী, তৈজসের ধার ধারি না–আমাদের দৌড় মালসা পর্যন্ত। তৈজসের খবর সাগরকে জিজ্ঞাসা কর।
    সা। আমি ঠিক কথা জানি। পুরুষমানুষ তৈজসের মধ্যে কলসী। সদাই অন্তঃশূন্য– আমরা যাই গুণবতী, তাই জল পুরিয়া পূর্ণকুম্ভ করিয়া রাখি।
    নিশি বলিল, “ঠিক বলিয়াছিস–তাই মেয়েমানুষে এ জিনিস গলায় বাঁধিয়া সংসার-সমুদ্রে ডুবিয়া মরে।-নে ভাই, তোর কলসী, কলসী পিঁড়ির উপর তুলিয়া রাখ।”
    ব্র। কলসী মানে মানে আপনি পিঁড়ির উপর উঠিতেছে।
    এই কথা বলিয়া ব্রজেশ্বর আপনি মসনদের উপর উঠিয়া বসিল। হঠাৎ দুই দিক হইতে দুই জন পরিচারিকা–সুন্দরী যুবতী, বহুমূল্য বসন-ভূষণ-ভূষিতা–দুইটা সোণাবাঁধা চামর হাতে করিয়া, ব্রজেশ্বরের দুই পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইল। আজ্ঞা না পাইয়াও তাহারা ব্যজন করিতে লাগিল। নিশি তখন সাগরকে বলিল, “যা, এখন তোর স্বামীর জন্য আপন হাতে তামাকু সাজিয়া লইয়া আয়।”
    সাগর ক্ষিপ্রহস্তে সোণার আলবোলার উপর হইতে কলিকা লইয়া গিয়া, শীঘ্র মৃগনাভি-সুগন্ধি তামাকু সাজিয়া আনিল। আলবোলায় চড়াইয়া দিল। ব্রজেশ্বর বলিলেন, “আমাকে একটা হুঁকায় নল করিয়া তামাকু দাও।”
    নিশি বলিল, “কোন শঙ্কা নাই–ঐ আলবোলা উৎসৃষ্ট নয়। কেহ কখন উহাতে তামাকু খায় নাই। আমরা কেহ তামাকু খাই না।”
    ব্র। সে কি? তবে এ আলবোলা কেন?
    নি। দেবীর রাণীগিরির দোকানদারি–
    ব্র। তা হৌক–আমি যখন আসিলাম, তখন যে তামাকু সাজা ছিল–কে খাইতেছিল?
    নি। কেহ না–সাজাও দোকানদারি–
    ঐ আলবোলা সেই দিন বাহির হইয়াছে–ঐ তামাকু সেই দিন কেনা হইয়া আসিয়াছে–সাগরের স্বামী আসিবে বলিয়া। ব্রজেশ্বর মুখনলটি পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন–অভুক্ত বোধ হয়। তখন ব্রজেশ্বর ধূমপানের অনির্বচনীয় সুখে মগ্ন হইলেন। নিশি তখন সাগরকে বলিল, “তুই পোড়ারমুখী, আর দাঁড়াইয়া কি করিস–পুরুষমানুষে হুঁকার নল মুখে করিলে আর কি স্ত্রী পরিবারকে মনে ঠাঁই দেয়? যা, তুই গোটাকত পান সাজিয়া আন। দেখিস–আপন হাতে পান সাজিয়া আনিস–পরের সাজা আনিস না–পারিস যদি একটু ওষুধ করিস।”
    সাগর বলিল, “আপন হাতেই সাজা আছে–ওষুধ জানিলে আমার এমন দশা হইবে কেন?”
    এই বলিয়া সাগর চন্দন কর্পূর চুয়া গোলাপে সুগন্ধি পানের রাশি সোণার বাটা পুরিয়া আনিল। তখন নিশি বলিল, “তোর স্বামীকে অনেক বকেছিস–কিছু জলখাবার নিয়ে আয়।”
    ব্রজেশ্বরের মুখ শুকাইল, “সর্বনাশ! এত রাত্রে জলখাবার! ঐটি মাফ করিও।”
    কিন্তু কেহ তাহার কথা শুনিল না–সাগর বড় তাড়াতাড়ি আর এক কামরায় ঝাঁট দিয়া, জলের হাত মুছিয়া, একখানা বড় ভারি পুরু আসন পাতিয়া চারি-পাঁচখানা রূপার থালে সামগ্রী সাজাইয়া ফেলিল। স্বর্ণ-পাত্রে উত্তম সুগন্ধি শীতল জল রাখিয়া দিল। জানিতে পারিয়া নিশি ব্রজেশ্বরকে বলিল, “ঠাঁই হইয়াছে–উঠ।” ব্রজেশ্বর উঁকি মারিয়া দেখিয়া, নিশির কাছে জোড়হাত করিল। বলিল, “ডাকাইতি করিয়া ধরিয়া আনিয়া কয়েদ করিয়াছ–সে অত্যাচার সহিয়াছে–কিন্তু এত রাত্রে এ অত্যাচার সহিবে না–দোহাই।”
    স্ত্রীলোকেরা মার্জনা করিল না। ব্রজেশ্বর অগত্যা কিছু খাইল। সাগর তখন নিশিকে বলিল, “ব্রাহ্মণ ভোজন করাইলে কিছু দক্ষিণা দিতে হয়।” নিশি বলিল, “দক্ষিণা রাণী স্বয়ং দিবেন। এসো ভাই, রাণী দেখিবে এসো।” এই বলিয়া নিশি ব্রজেশ্বরকে আর এক কামরায় সঙ্গে করিয়া লইয়া গেল।