বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: কৃষ্ণ-প্রিয়া লো! কেমনে যাবি অভিসারে
কৃষ্ণ-প্রিয়া লো! কেমনে যাবি অভিসারে?
সে বিরহী রহে মানস সুরধুনী 'পারে॥
সে এ পারে রহে না
পারাপারের অতীত সে, এ পারে রহে না,
এ পারে না, ও পারেও রহে না, কোন পারে রহে না॥
গগনে গুরু গুরু মেঘ গরজে অবিরল বাদল ঝর ঝর ঝরে,
আঁখি-জলে আঁখি তোর টলমল সই অন্তর দুরুদুরু করে।
পথ দেখিবি কেমনে
আঁখি-জলে পিছল আঁখি, পথ দেখিবি কেমনে।
তোর আঁখি পিছল পথও পিছল পথে যাবি কেমনে,
তোর অন্তরে মেঘ, বাহিরে মেঘ পথ দেখিবি কেমনে।
একে কুহু-যামিনী তাহে কুল-কামিনী পথে পথে কালনাগিনী (লো),
আছে আড় পেতে শাশুড়ি ননদিনী লো।
তুই চাতকীর মত কেতকীর মত রাই
মেঘ দেখে মত্ত হইলি ভয় নাই,
যার প্রেমের পথে বাধা বিধির অভিশাপ ─ সাপেরে সে ভয় করে না॥
- ভাবসন্ধান: রাধাকৃষ্ণের প্রণয়াভিসারের রূপকতায়- এই গানে উপস্থাপন করা
হয়েছে রাধার মনোলোকের চিরন্তন অভিসারের চিত্র। এ গানের দুর্যাগঘন ভয়ঙ্কর রাত্রি
হলো- কৃষ্ণ-প্রেমের সকল প্রতিবন্ধকতা। তাঁর সখিরা হলেন মনোলোকের
শুভানুধ্যায়ীবৃন্দ। সকল প্রতিকূলতাকে জয় করে প্রেমের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর
ভাবনা- নানা রূপকতার মধ্য দিয়ে এই গানে উপস্থাপিত হয়েছে।
এই গানের সাধারণ রূপ হলো- দুর্যোগ-ঘন বর্ষার এক ভয়ঙ্কর রাতে কৃষ্ণের অভিসারে যাবেন কৃষ্ণ-প্রিয়া রাধিকা।
সখিদের সংশয়- কেমন করে তিনি এই বিপদসঙ্কুল রাতে কৃষ্ণের কাছে যাবেন। মূলত এ
গানের স্থায়ীতে রাধার দুর্গম অভিসারের পথের প্রতিকূলতা এবং তাঁর মানসিক অবস্থাকে
উপস্থাপন করা হয়েছে- তাঁর সখিদের উদ্বেগের মাধ্যমে। অন্তরাতে এসে বিষয়টি
পরিষ্কার হয়ে যায়।
গানের এই অংশে বলা হয়েছে- রাধার কাঙ্ক্ষিত কৃষ্ণ থাকেন 'মানস সুরধুনী' অর্থাৎ
মননদীর ওপারে। তিনি পার্থিব জগতের সীমার অতীত, মনোলোকের ঊর্ধ্বে বিরাজিত একটি
সত্তা। তাঁকে লাভ করার পথটিও মানসিক ও আধ্যাত্মিক। বৃন্দাবনের সামগ্রিক পরিবেশ
হলো- রাধার ভাবনার উপরিতল মাত্র।
বর্ষার দুর্যোগময় ভয়ঙ্কর রাতের আকাশে গুরু গুরু মেঘ গর্জন এবং ঝরে
পড়া অবিরল বাদলধারায়- রাধিকার মনেও উঠেছে অভিসারের যাওয়ার ঝড়। কিন্তু এমন
ভয়ঙ্কর রাত হয়ে উঠেছে তার প্রতিবন্ধক। তাই রাধিকার আঁখি ভরে উঠেছে
আঁখি-জলে। সখিরা রাধার এই অভিসারে যাওয়ার প্রতিকূলতা উল্লেখ করে বলছেন-
তিনি পথ দেখে যাবেন কি করে? বর্ষণসিক্ত বনভূমির পথ পিছল, তাঁর চোখের জলে
দৃষ্টিশক্তিও পিছল (বিভ্রমযুক্ত)। সখিদের সংশয়- রাধার অন্তরের প্রেমাভিসারের পথ
অনিশ্চিত অন্ধকার মেঘে ঢাকা, বাইরে জগতও বর্ষার মেঘে ঢাকা। এমন পরিবেশে কৃষ্ণের
সাথে মিলিত হবেন কি ভাবে। এমনিতে রাতটি অমাবস্যার (কুহু-যামিনী) অন্ধকারের ঢাকা
, তার উপর রাধা 'কুল-কামিনী' বা কুলবধূ। যাঁর সামাজিক সম্ভ্রম ও মর্যাদার ভূকুটি কালনাগিনীর
মতো ফণা তুলে আছে। যেন ছোবল দেওয়ার জন্য আড়ি পেতে আছে রাধার শাশুড়ি ননদিনী।
এত বাধা সত্ত্বেও কৃষ্ণের জন্য রাধার মন উচাটন। কৃষ্ণের প্রেমবারির পানের আশায়
রাধা চাতক পাখির মতো উদ্গ্রীব হয়ে আছেন। বর্ষার মেঘ দেখে কেতকী যেমন যৌবানন্দে
প্রস্ফুটিত হয়, কৃষ্ণাভিসারে রাধা তেমনি প্রস্ফুটিতা হয়েছেন। প্রেমাভিসারে বিধি
(ভাগ্যলিখন) যখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়, তখন অকল্যণের সর্পের ভয় করে লাভ।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২) -এর ১২১৬ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৩৭০।
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধা। প্রণয়াভিসার