বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: (তোমায়) যেমন ক’রে ডেকেছিল আরব মরুভূমি
(তোমায়) যেমন ক’রে ডেকেছিল আরব মরুভূমি।
ওগো আমার নব প্রিয় আল্ আরবী –
তেমনি ক’রে ডাকি-যদি আস্বে নাকি তুমি॥
যেমন কেঁদে দজলা ফোরাত নদী
ডেকেছিল নিরবধি,
হে মোর মরুচারী নবুয়তধারী!
তেমনি ক’রে কাঁদি যদি আসবে নামি তুমি॥
(যেমন) মদিনা আর হেরা পাহাড়
জেগেছিল আশায় তোমার,
হে হজরত মম, হে মোর প্রিয়তম!
তেমনি ক’রে জাগি যদি আসবে না কি তুমি॥
মজলুমেরা কাবা ঘরে
কেঁদেছিল যেমন ক’রে,
হে আমিনা-লালা, হে মোর কম্লিওয়ালা!
তেমনি ক’রে চাহি যদি আস্বে নাকি তুমি॥
- ভাবার্থ: এই গানে কবি গভীর ভক্তি, প্রেম ও আকুলতার সঙ্গে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর
সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা রূপকল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তিনি বিশ্বাস
করেন, যদি গভীর নিষ্ঠা, প্রেম ও আন্তরিকতার সঙ্গে নবীকে আহ্বান করা যায়, তবে
সেই আহ্বান ব্যর্থ হয় না। এখানে নবীকে পার্থিবভাবে আহ্বান করা হয়নি; বরং এটি
অন্তরলোকের ধ্যানমগ্ন ডাক।
গানের শুরুতেই কবি এক সংশয়মিশ্রিত প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। যেমন করে আরবের
নির্জন মরুভূমি নবীর আগমনের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল, তেমনি করে তিনি যদি
ডাকেন, তবে নবী কি তাঁর সেই আহ্বানে সাড়া দেবেন না—এই প্রশ্ন তাঁর মনে জাগে।
এখানে ‘আরব মরুভূমি’ প্রতীক হয়ে উঠেছে তৎকালীন নিষ্ঠুর, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও
মানবতাশূন্য সমাজের, যেখানে নবীর আবির্ভাব মানবিকতা ও সত্যের আলো নিয়ে আসে।
দজলা ও ফোরাত নদীর অবিরাম ধ্বনি, মদিনা ও হেরা পর্বতের জাগ্রত প্রতীক্ষা—এসবই নবীর আগমনের আকুল প্রত্যাশার রূপক। কবি মনে করেন, তিনিও যদি তেমনি করে ধ্যানলোকে অবিরাম ডাকেন, তবে সেই আহ্বান কি উপেক্ষিত থাকবে?
যেমন করে অত্যাচারিত ও নিপীড়িত মানুষ কাবা ঘরে কান্নার মাধ্যমে মুক্তির
জন্য প্রার্থনা করেছিল, তেমনি করেই কবি নবীর সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা
প্রকাশ করেছেন। ‘আমিনা-লালা' (আমিনার প্রিয়পুত্র) ও ‘কমলিওয়ালা’ সম্বোধনের
মাধ্যমে তাঁর প্রতি কবির গভীর প্রেম, শ্রদ্ধা ও অন্তরঙ্গতা ফুটে উঠেছে।
- কমলিওয়ালা: আরবি ‘কিসা’ বা ‘বুরদাহ’ শব্দের বাংলা রূপান্তর, যার অর্থ সাধারণ চাদর, কম্বল বা মোটা বস্ত্র।
ওয়ালা এটি একটি প্রত্যয়, যার অর্থ ‘অধিকারী’ বা ‘পরিধানকারী’।
সুতরাং, আক্ষরিকভাবে “কমলিওয়ালা” শব্দের অর্থ হলো “যিনি কম্বল বা চাদর পরিধান করেছেন” বা “চাদর জড়ানো ব্যক্তি”।
সুফি ঐতিহ্য ও বাংলা মরমী সাহিত্যে (যেমন কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামি গানগুলোতে) “কমলিওয়ালা” শব্দটি দ্বারা নবীজি (সা.)-এর চরম বৈরাগ্য, বিনয়, সাধারণ জীবনযাপন ও মানবতাবোধকে ফুটিয়ে তোলা হয়। বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হওয়া সত্ত্বেও তিনি রাজকীয় পোশাক পরিহার করে সাধারণ একটি কালো বা ডোরাকাটা চাদর (কমলি) গায়ে জড়াতেন। এই সাদাসিধে রূপটিই কবি ও ভক্তদের হৃদয়ে গভীর ভালোবাসার স্থান করে নিয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৬) মাসে টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির
প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
- জুলফিকার
- দ্বিতীয় সংস্করণ [ডিসেম্বর, ১৯৫২ (পৌষ ১৩৫৯ বঙ্গাব্দ)]
- নজরুল রচনাবলী সপ্তম খণ্ড [কার্তিক ১৪১৯, নভেম্বর ২০১২।
জুলফিকার দ্বিতীয় খণ্ড। ১৯ [১৮]। পৃষ্ঠা ১০০]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। গান সংখ্যা
১৪৮৫। পৃষ্ঠা: ৪৪৬]
- রেকর্ড: টুইন [অক্টোবর ১৯৩৯ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৬)। এফটি ১৩০০৬। শিল্পী: সিরাজুর রহমান]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ রসুল। প্রার্থনা