বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: দীন দরিদ্র কাঙালের তরে এই দুনিয়ায় আসি
দীন দরিদ্র কাঙালের তরে এই দুনিয়ায় আসি’,
হে হজরত বাদশাহ্ হয়েছিলে উপবাসী।
(তুমি) চাহ নাই কেহ হইবে আমীর, পথের ফকির কেহ
(কেহ) মাথা গুঁজিবার পাইবে না ঠাঁই, কাহারো সোনার গেহ,
ক্ষুধার অন্ন পাইবে না কেহ, কারো শত দাস-দাসী॥
(আজ) মানুষের ব্যথা অভাবের কথা ভাবিবার কেহ নাই
ধনী মুস্লিম ভোগ ও বিলাসে ডুবিয়া আছে সদাই,
(তাই) তোমারেই ডাকে যত মুস্লিম গরীব শ্রমিক চাষী॥
বঞ্চিত মোরা হইয়াছি আজ তব রহমত হ’তে
সাহেরবী গিয়াছে, মোসাহেরী করি ফিরি দুনিয়ার পথে,
আবার মানুষ হব কবে মোরা মানুষেরে ভালবাসি’॥
-
ভাবার্থ: এই গানে কবি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) -এর আদর্শের
আলোকে মানবসমাজে বিরাজমান বৈষম্য, দারিদ্র্য ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের চিত্র
তুলে ধরেছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, মহানবী (সা.) পৃথিবীতে এসেছিলেন
দীন-দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের কল্যাণের জন্য। তিনি বাদশাহসুলভ ক্ষমতা ও
মর্যাদার অধিকারী হয়েও অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করেছেন এবং কখনো ধনসম্পদ ও
বিলাসিতাকে জীবনের লক্ষ্য মনে করেননি।
তিনি চাননি
সমাজে এমন বৈষম্য থাকুক, যেখানে কেউ অঢেল সম্পদের অধিকারী হয়ে সোনার প্রাসাদে বাস
করবে, আর কেউ মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে না; কারও শত শত দাস-দাসী থাকবে, আর কেউ ক্ষুধা
নিবারণের জন্য অন্নের সংস্থান করতে পারবে না। তাঁর আদর্শ ছিল সাম্য, ন্যায় ও
মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা।
কবি আক্ষেপ করে বলেছেন, ইসলামের সেই মহান
আদর্শ আজ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও অভাব-অভিযোগের কথা ভাবার লোক
ক্রমেই কমে যাচ্ছে। অনেক ধনী মুসলমান ভোগ-বিলাসে মগ্ন হয়ে পড়েছে এবং মহানবীর
আদর্শ থেকে দূরে সরে গেছে। তাই আজ তাঁকে স্মরণ করে এবং তাঁর কাছে মুক্তি কামনা করে
মূলত গরিব, শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণির মানুষ।
কবির মতে, মানুষ মহানবীর করুণা, মানবতা ও
ন্যায়বোধের শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলেই সমাজে বৈষম্য, শোষণ ও অমানবিকতা বেড়ে
গেছে। ফলে মুসলমানরা তাঁর রহমত থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। একসময়ের সাহেবী—অর্থাৎ নেতৃত্ব,
মর্যাদা, আত্মমর্যাদাবোধ ও গৌরবময় অবস্থান—লুপ্ত হয়ে গেছে; তার পরিবর্তে স্থান করে
নিয়েছে মোসাহেবী—অর্থাৎ তোষামোদ, চাটুকারিতা এবং স্বার্থের জন্য ক্ষমতাবানদের
অনুসরণ করার প্রবণতা।
গানের
শেষে কবি আশা প্রকাশ করেছেন যে, মানুষ এসব কুপ্রবৃত্তি পরিত্যাগ করে আবার প্রকৃত
মানুষ হয়ে উঠবে। মহানবীর শিক্ষা অনুসরণ করে মানবপ্রেম, সহমর্মিতা, সাম্য ও
ন্যায়বোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই পরস্পরকে ভালোবাসবে এবং একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক
সমাজ গড়ে তুলবে।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির
রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের
মার্চ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৫) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৯ মাস।
- গ্রন্থ:
-
বনগীতিকা
- দ্বিতীয় সংস্করণ [১৩৫৯ বঙ্গাব্দের
১১ই জ্যৈষ্ঠ (২৫ মে, ১৯৫২)]
- নজরুল রচনাবলী সপ্তম খণ্ড [কার্তিক ১৪১৯, নভেম্বর ২০১২। বনগীতি দ্বিতীয় খণ্ড। ৪। পৃষ্ঠা ১১৫]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২)। ১৪৮৭ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৪৪৭]
- রেকর্ড: এইচএমভি [মার্চ ১৯৩৯ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৫)। এন ১৭২৬৪। শিল্পী
আব্দুল গফুর। সুর: নজরুল]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল। আদর্শ অনুসরণ