ভাবসন্ধান:
এই গানে শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুরে ব্রজগোপীদের হৃদয়ে জেগে ওঠা কৃষ্ণপ্রেম, আত্মবিস্মৃতি ও আধ্যাত্মিক
ভাবাবেগের চিত্র অঙ্কন করেছেন। কৃষ্ণের বাঁশি এখানে কেবল একটি বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি নয়; এটি
তাঁর আহ্বান। যা সংসারের সকল বন্ধন অতিক্রম করে ভক্তের মনকে তাঁর দিকে আকর্ষণ করে।
গানের শুরুতেই কবি বলেন, বৃন্দাবনে কৃষ্ণের বাঁশি এমন মধুর সুরে বেজে উঠেছে যে, গোপিনীরা আত্মহারা হয়ে পড়েছে। সংসারের কোনো কাজেই আর তাদের মন বসছে না। কৃষ্ণপ্রেম তাদের চিত্তকে সম্পূর্ণভাবে অধিকার করেছে। এখানে গোপিনীদের এই উন্মনা অবস্থা জাগতিক কর্তব্য থেকে বিচ্যুতি নয়; বরং ঈশ্বরপ্রেমে আত্মবিস্মৃত হওয়ার প্রতীক।
গানের পরবর্তী অংশে রূপকল্পে উপস্থাপিত করেন- যেন কুলবধূদের জলভরা ঘটের মধ্যেও যেন সেই বাঁশির সুর প্রতিধ্বনিত হয়। অর্থাৎ
জনপদবাসী যেখানে যেভাবে থাকুন, কৃষ্ণের আহ্বান থেকে তাঁরা মুক্ত হতে পারেন না। তাঁদের মন
থাকে সর্বদা কৃষ্ণাবেশে নিমগ্ন। বাহ্যিকভাবে তাঁরা জল তুলছে, কিন্তু অন্তরে তাঁরা কৃষ্ণের বাঁশির সুরই শুনছেন।
এর ফলে তাঁদের হাতে ধরা জলের ঘট বারবার উথলে ওঠে, আর চোখ থেকে অশ্রুধারা ঝরে সেই ঘটের জলের সঙ্গে মিশে যায়। এই অশ্রু সাধারণ দুঃখের নয়; এটি বিরহ, প্রেম ও ভক্তির অশ্রু।
কৃষ্ণের সান্নিধ্যলাভের আকাঙ্ক্ষায় তাঁদের হৃদয় এতটাই ব্যাকুল যে, দৈনন্দিন কাজের মধ্যেও সেই প্রেমের আবেগ অবিরাম
উদ্ভাসিত হয়।
এখানে গোপিনীদের প্রেম আসলে আত্মার সঙ্গে কৃষ্ণের সাথে মিলনের আকুল আকাঙ্ক্ষারই প্রতীক।
রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৩৩৬ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ (ডিসেম্বর ১৯২৯) মাসে প্রকাশিত 'চোখের চাতক' সঙ্গীত-সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩০ বৎসর ৬ মাস।