বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: বেদনার বেদীতলে পেতেছি আসন, হে দেবতা!
বেদনার বেদীতলে পেতেছি আসন, হে দেবতা!
সেথা আর কেহ নাই আমরা দু’জন, কহিব কথা॥
বাহির ভুবনে তব কত পূজারী
সেথায় মনের কথা কহিতে নারি,
তাই হৃদয় দেউলে রেখে’ দিয়েছি আগল –
সেথা তোমার চরণ-তলে জানাব গোপন প্রাণের ব্যথা॥
পূজা-মন্দির হ’তে এসে চুপে চুপে
হে দেবতা! সাজায়েছি প্রিয় রূপে!
সবার সমুখে তাই মালা দিতে লাজ পাই –
প্রেমের বাসর ঘরে পরাব বরণ-মালা, হব প্রণতা॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে ভক্তের অন্তরের নিবেদিত প্রেম, নিভৃত উপাসনা এবং
পরমাত্মার সঙ্গে একান্ত আত্মিক সংলাপের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। এখানে পরমাত্মা কেবল পূজার আরাধ্য নন; তিনি ভক্তের অন্তরতম প্রিয়জনও। তাই এই উপাসনা আচারনির্ভর নয়, প্রেমনির্ভর।
গানের শুরুতেই কবি বলেন, তিনি বেদনার বেদীতলে নিজের আসন পেতেছেন। অর্থাৎ জীবনের দুঃখ, বিরহ ও বেদনাকেই তিনি
পরমাত্মার সাধনার পবিত্র বেদিতে রূপান্তরিত করেছেন। সেই নিভৃত সাধনাক্ষেত্রে আর কেউ নেই—শুধু ভক্ত ও তাঁর আরাধ্য
পরমসত্তা। সেখানে তিনি অকপটে হৃদয়ের সব কথা বলতে চান।
গানের পরবর্তী স্তবকে কবি বলেন, বাহিরের জগতে তাঁর অসংখ্য নিবেদিত ভক্ত থাকলেও, জনসমক্ষে তিনি নিজের মনের গভীর অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন না। তাই তিনি হৃদয়কেই
পরমাত্মার মন্দিরে পরিণত করেছেন এবং সেই মন্দিরের দ্বার বন্ধ করে দিয়েছেন। সেই অন্তরমন্দিরে,
তাঁর চরণে তিনি তাঁর সকল গোপন বেদনা, আকাঙ্ক্ষা ও প্রেম নিবেদন করবেন। এখানে হৃদয়ই প্রকৃত মন্দির, আর আন্তরিক অনুভূতিই প্রকৃত পূজা।
গানের শেষাংশে কবি এক অপূর্ব রূপক ব্যবহার করে বলেছেন, পরমাত্মাকে তিনি পূজামন্দিরের দূরবর্তী দেবমূর্তি হিসেবে নয়, অন্তরের প্রিয়তম রূপে সাজিয়ে নিয়েছেন। তাই সকলের সামনে তাঁকে মালা পরাতে সংকোচ বোধ করেন। তিনি চান, নিভৃত প্রেমের বাসরঘরে নিজের হাতে তাঁকে বরণমালা পরিয়ে চিরদিনের জন্য তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করতে। এখানে 'বরণমালা' কেবল ফুলের মালা নয়; এটি আত্মনিবেদন, প্রেম ও চিরন্তন মিলনের প্রতীক।
এই গানে বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের পরিবর্তে অন্তরের নিভৃত প্রেমসাধনা, ঈশ্বরকে প্রিয়তম রূপে উপলব্ধি, বেদনাকে সাধনার উপায়ে রূপান্তর এবং সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত মাধুর্যময় ও আধ্যাত্মিক ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। ভক্ত ও ভগবানের সম্পর্ক এখানে পূজারি ও
পরমাত্মার সীমা অতিক্রম করে প্রেমিক ও প্রিয়তমের অন্তরঙ্গ সম্পর্কে উন্নীত হয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন-১৩৪৫) মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি এই গানটির
প্রথম রেকর্ড
করেছিল। পরে রেকর্ডটি বাতিল হয়ে গিয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
১৬২৬। পৃষ্ঠা: ৪৮৬]
- রেকর্ড:
- ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ তারিখে (২২ ভাদ্র ১৩৪৫) নজরুলের সাথে এইচএমভি
রেকর্ড কোম্পানির চুক্তি হয়। এই চুক্তিতে গানটি ছিল।
- টুইন [সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৫)।
শিল্পী: অলোকা ঘোষ। রেকর্ডটি বাতিল হয়ে যায়]
- কলম্বিয়া [মার্চ ১৯৫৪ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৬০)। জিই ২৪৭২০। শিল্পী:
কুমার সুমিত্রা দাশগুপ্তা। সুর দুর্গা সেন]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। সাধারণ। পরমাত্মা।