বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মরুর ফুল ঝরিল অবেলাতে
মরুর ফুল ঝরিল অবেলাতে
ফোরাত নদী কাঁদে বেদনাতে।
সাকিনা কাঁদে প’ড়ে ধূলায়
হাতের মেহদী মুছিয়া হায়,
কেয়ামত এলো যেন কারবালাতে॥
খুনের বাদল ঝরিছে আসমানে
হুরপরী কাঁদে থির নাহি মানে।
কাঁদিছে আলি ফাতেমা কাঁদে
ঘেরিল মেঘে সূরয চাঁদে
ঝরিছে আঁসু রসুলের আঁখি-পাতে
- ভাবসন্ধান: কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীদের আত্মত্যাগ মানবজাতির জন্য সত্য, ন্যায় ও আদর্শ রক্ষার এক চিরন্তন দৃষ্টান্ত। কবি প্রকৃতি, আকাশ, নদী ও সমগ্র সৃষ্টিজগতকে শোকাহত রূপে কল্পনা করে এই ঘটনার গভীর বেদনাকে প্রকাশ করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে কারবালার শোক কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের জন্য আত্মোৎসর্গের এক অনন্ত স্মারক।
এই গানে কবি কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার শোকাবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। শোক, বেদনা, আত্মত্যাগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের সংগ্রাম—এই চারটি অনুভূতি গানটির মূল সুর। কবি এমনভাবে ঘটনাটিকে উপস্থাপন করেছেন যেন শুধু মানুষ নয়, সমগ্র প্রকৃতিও এই ট্র্যাজেডিতে শোকাহত হয়ে পড়েছে।
গানের শুরুতেই কবি বলেন, 'মরুর ফুল ঝরিল অবেলাতে'। এখানে মরুর ফুল বলতে ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের নিষ্পাপ সদস্যদের বোঝানো হয়েছে, যাঁদের জীবন অকালে ঝরে যায়। ফোরাত নদী-কেও কবি কাঁদতে দেখিয়েছেন। এটি একটি মানবায়ন; নদী বাস্তবে কাঁদে না, কিন্তু কারবালায় ফোরাতের পানি থেকে বঞ্চিত হয়ে শহীদদের যে অসীম কষ্ট ভোগ করতে হয়েছিল, তারই প্রতীকী প্রকাশ এই চিত্র।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি সাকিনা-র অসহায় অবস্থার কথা বলেছেন। তিনি ধুলায় লুটিয়ে কাঁদছেন, হাতে আঁকা মেহেদির রঙ মুছে যাচ্ছে। এই দৃশ্য কারবালার নারীদের সীমাহীন শোক, অসহায়ত্ব ও বেদনাকে ফুটিয়ে তোলে। কবির মনে হয়, যেন কিয়ামতের দিন নেমে এসেছে—অর্থাৎ এমন ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক ঘটনা মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিরল।
এরপর কবি বলেন, আকাশ থেকে যেন রক্তের বৃষ্টি ঝরছে এবং জান্নাতের হুরপরীরাও শোকসংবরণ করতে পারছে না। এটি বাস্তব ঘটনা নয়; বরং কারবালার ঘটনার ভয়াবহতা বোঝাতে ব্যবহৃত শক্তিশালী কাব্যিক রূপক। কবি আরও কল্পনা করেন যে, আলী ইবন আবি তালিব ও ফাতিমা-ও যেন তাঁদের প্রিয় সন্তান ও দৌহিত্রদের জন্য শোক করছেন। সূর্য ও চাঁদ মেঘে ঢেকে যাওয়ার চিত্রও সমগ্র বিশ্বজগতের শোকের প্রতীক।
সবশেষে কবি বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চোখ থেকেও যেন অশ্রু ঝরছে। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে, কারবালার এই আত্মত্যাগ ও নিষ্ঠুরতা ইসলামের ইতিহাসে এক গভীর বেদনাময় অধ্যায়, যা নবীপ্রেমী প্রতিটি হৃদয়কে আজও ব্যথিত করে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ (ফাল্গুন-চৈত্র
১৩৪৩) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ৯ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৭০৩। পৃষ্ঠা:
৫০৮]
- রেকর্ড: এইচএমভি [মার্চ ১৯৩৭ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৩)]। এন ৯৮৭২। শিল্পী:
মুসলিম বন্ধুদ্বয়
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। মর্সিয়া।