বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মা গো আমায় শিখাইলি কেন
মাগো আমায় শিখাইলি কেন আল্লা নাম।
নাম জপিলে আর হুঁশ থাকে না, ভুলি সকল কাম॥
লোকে বলে, আল্লাতালায় যায় না নাকি পাওয়া
ও-নাম জপিলে প্রাণে কেন বহে দখিন হাওয়া।
ও-নাম জপিলে হিয়ার মাঝে কেন এত ব্যথা বাজে,
কে তবে মা আমার বুকে কাঁদে অবিরাম॥
পুরুষরা সব মস্জিদে যায় আমি ঘরে কাঁদি
কে যেন কয় কানের কাছে তুই যে আমার বাঁদি –
তাই ঘরে রাখি বাঁধি’।
মা গো আমার নামাজ রোজা খোদায় ভালোবাসা
ঐ নাম জপিলেই মেটে আমার
বেহেশ্তের পিয়াসা,
শত ঈদের চাঁদও দিতে নারে আল্লাহ্ নামের দাম॥
-
ভাবানুসন্ধান: আল্লাহর নামের মধ্যে নিহিত আধ্যাত্মিক আনন্দ, প্রেম ও আত্মসমর্পণের অনুভূতি প্রকাশ করা। কবি দেখিয়েছেন, সত্যিকারের ঈশ্বরপ্রেম মানুষের অন্তরকে এমনভাবে রূপান্তরিত করে যে, পার্থিব আকর্ষণ তুচ্ছ হয়ে যায় এবং আল্লাহর স্মরণই জীবনের সর্বোচ্চ শান্তি, পরম আনন্দ ও মুক্তির উৎস হয়ে ওঠে।
এই আদর্শে রচিত এই গানে- কবি আল্লাহর নামের প্রতি এক নিবেদিতপ্রাণ ভক্তের গভীর প্রেম, আত্মসমর্পণ ও আধ্যাত্মিক অনুভূতি
উপস্থাপন করেছেন। এখানে ভক্তের হৃদয় এমনভাবে আল্লাহর প্রেমে নিমগ্ন যে, তাঁর কাছে পার্থিব জীবন ও কাজের চেয়ে আল্লাহর স্মরণই সর্বাধিক মূল্যবান হয়ে উঠেছে।
গানের শুরুতেই কবি মায়ের উদ্দেশে বলেন- 'তুমি আমাকে কেন আল্লাহর নাম জপ করতে শিখিয়েছিলে? কারণ একবার সেই নামের স্বাদ পাওয়ার পর আর সংসারের কোনো কাজেই মন বসে না।' এখানে কোনো অভিযোগ নেই; বরং আল্লাহর নামের প্রতি এমন গভীর অনুরাগ প্রকাশ পেয়েছে, যা মানুষের সমস্ত পার্থিব আকর্ষণকে ম্লান করে দেয়।
এরপর কবি বলেন, অনেকে বলে আল্লাহকে নাকি দেখা বা পাওয়া যায় না। কিন্তু তিনি অনুভব করেন, আল্লাহর নাম জপ করলেই তাঁর অন্তরে এক অপূর্ব প্রশান্তি ও আনন্দের বাতাস বইতে থাকে। আবার একই সঙ্গে হৃদয়ে এক গভীর ব্যথাও জেগে ওঠে। এই ব্যথা দুঃখের নয়; এটি প্রিয়তমের বিরহ, আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আকুলতা এবং
তাঁর প্রেমের তীব্র আবেগ। তাই তিনি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেন- 'আমার হৃদয়ের মধ্যে এমন করে কে কাঁদে?' এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর প্রেমে উদ্বেলিত আত্মা নিজেই প্রিয়তমের জন্য আকুল হয়ে ওঠে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি পুরুষ শাসিত সমাজের বিভিন্ন স্তরে নারীর প্রতি যে বৈষম্য
রয়েছে, তার অন্তর্বেদনা উপস্থাপিত হয়েছে নারীর অভিব্যক্তিতে। এই নারী বলেন- পুরুষেরা মসজিদে গিয়ে ইবাদত করেন, আর ঘরে বসেই কান্নায় আল্লাহকে স্মরণ করেন।
তিনি একে আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করে- আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য প্রকাশের অনুগ্রহ
হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর মনে হয়, যেন আল্লাহ নিজেই তাঁকে বলছেন, "তুমি তো আমার দাসী।" এই অনুভূতি তাঁকে সর্বদা আল্লাহর সান্নিধ্যে আবদ্ধ রাখে। অর্থাৎ স্থান নয়, আন্তরিক ভক্তিই আল্লাহর নৈকট্য লাভের মূল উপায়।
গানের শেষাংশে কবি বলেন, তাঁর কাছে নামাজ, রোজা এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা- সবই একসূত্রে গাঁথা। আল্লাহর নাম জপ করলেই তাঁর অন্তরের জান্নাতের তৃষ্ণা মিটে যায়। তিনি আরও বলেন, শত ঈদের আনন্দও আল্লাহর নামের মহিমার সমান হতে পারে না। অর্থাৎ আল্লাহর স্মরণ থেকে যে আত্মিক আনন্দ ও তৃপ্তি লাভ হয়, তা পৃথিবীর কোনো উৎসব বা পার্থিব সুখের সঙ্গে তুলনীয় নয়।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল (চৈত্র ১৩৪৭-বৈশাখ ১৩৪৮) মাসে, সেনোলা রেকর্ড কোম্পানি এই গানটির রেকর্ড করেছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ১০ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ
(নজরুল ইন্সটিটিউট। ফেব্রুয়ারি ২০১২)।
১৭০৪ সংখ্যক গান।
পৃষ্ঠা: ৫০৮।
- রেকর্ড:
সেনোলা [এপ্রিল ১৯৪১
খ্রিষ্টাব্দ (চৈত্র ১৩৪৭-বৈশাখ ১৩৪৮) কিউ
এস ৫২১। শিল্পী: নীলিম খাতুন। সুর নজরুল ইসলাম]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। হামদ। আত্মনিবেদন