বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মাঠে আমার ফল্ল ফসল মনের ফসল কই
মাঠে আমার ফল্ল ফসল মনের ফসল কই
শূন্য মনে আল্লা তোমার পানে চেয়ে রই॥
আরব মরুভূমে নবীজীরে পাঠাইলে
আমার মনের মরুভূমি বিফল রাখিলে,
গরীব ব’লে আমি কি গো বান্দা তব নই॥
চাই না যশ মান আমি চাহি না দৌলৎ,
আমি চাহি শুধু – তোমার নামেরি সরবত
যে যাহা চায় তুমি নাকি তারে তাহাই দাও
আমার মানত পূর্ণ ক’রে পরান বাঁচাও,
আমি যেন আল্লা নামের তস্বি শুধু বই॥
- ভাবসন্ধান: পার্থিব প্রাপ্তির চেয়ে আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধিই মানুষের প্রকৃত সম্পদ। কবি আল্লাহর কাছে ধন-সম্পদ বা খ্যাতি নয়, বরং ঈমান, আত্মশুদ্ধি, অন্তরের উর্বরতা এবং সারাজীবন আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকার শক্তি প্রার্থনা করেছেন। তাঁর মতে, আল্লাহর প্রেমেই মানুষের হৃদয়ের প্রকৃত শূন্যতা পূর্ণ হয়।
আদর্শে এই গানে কবি আল্লাহর প্রতি এক দরিদ্র, বিনম্র ও ব্যাকুল ভক্তের হৃদয়ের আকুতি প্রকাশ করেছেন। বাহ্যিক জীবনে সাফল্য ও প্রাচুর্য থাকলেও তাঁর অন্তর আধ্যাত্মিকভাবে শূন্য। সেই শূন্যতাকে আল্লাহর প্রেম, স্মরণ ও হেদায়েত দিয়ে পূর্ণ করে দেওয়ার জন্যই তিনি প্রার্থনা করছেন।
গানের শুরুতেই আক্ষেপের সুরে বলেছেন, তাঁর মাঠে প্রচুর ফসল ফলেছে, অর্থাৎ পার্থিব জীবনে কিছু সাফল্য ও প্রাপ্তি এসেছে; কিন্তু তাঁর মনের ফসল ফলে নি। এখানে মনের ফসল বলতে ঈমান, আল্লাহর প্রেম, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতাকে বোঝানো হয়েছে। তাই তিনি শূন্য হৃদয় নিয়ে আল্লাহর দিকে চেয়ে থাকেন এবং তাঁর রহমতের অপেক্ষা করেন।
এরপর কবি একটি সুন্দর রূপকের আশ্রয় নেন। তাঁর মতে, আল্লাহ যেমন আরবের অনুর্বর মরুভূমিতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পাঠিয়ে সেই অঞ্চলকে ঈমান ও হেদায়েতের আলোয় আলোকিত করেছিলেন, তেমনি তাঁর নিজের হৃদয়ও যেন এক মরুভূমি। তিনি প্রশ্ন করেন-
'হে আল্লাহ, আমার অন্তরকে কেন অনুর্বর রেখেছ? আমি কি দরিদ্র বলে তোমার বান্দা নই?' এই প্রশ্নে কোনো অভিযোগের সুর নেই; বরং রয়েছে করুণাভরা মিনতি এবং আল্লাহর রহমত লাভের আকাঙ্ক্ষা।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি তাঁর অভিমত প্রকাশ করে বলেন, তিনি পৃথিবীর যশ, সম্মান বা ধনসম্পদ চান না। তাঁর একমাত্র আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর নামের
'সরবত'। এখানে সরবত রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; এটি আল্লাহর স্মরণ, প্রেম ও আত্মিক প্রশান্তির প্রতীক। যেমন সরবত তৃষ্ণা নিবারণ করে, তেমনি আল্লাহর স্মরণ মানুষের আত্মার তৃষ্ণা দূর করে এবং অন্তরে শান্তি এনে দেয়।
গানটির শেষাংশে কবি আল্লাহর অসীম দয়ার ওপর ভরসা রেখে বলেন, মানুষ যা আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করে, আল্লাহ তা দান করেন। তাই তিনি নিজের মানত পূর্ণ করার এবং তাঁর প্রাণকে আধ্যাত্মিকভাবে সঞ্জীবিত করার আবেদন জানান। তাঁর শেষ কামনা—সমস্ত জীবন যেন আল্লাহর নামের তাসবিহ হয়ে কাটে; অর্থাৎ তাঁর চিন্তা, বাক্য ও কর্ম সর্বদা আল্লাহর স্মরণে নিবেদিত থাকুক।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৪৭) মাসে টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির
প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ২ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২)-এর ১৭০৫ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা:
৫০৮।
-
রেকর্ড:
টুইন [আগষ্ট ১৯৪০ (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৪৭)। এন ১৩৩৯৫। শিল্পী: আশরাফ আলী।
- সুরকার:
নজরুল ইসলাম
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। আত্ম-বোধ
- সুরাঙ্গ:
স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গান
- তাল:
কাহারবা
- গ্রহস্বর:
স