বিষয়: নজরুলসঙ্গীত।
শিরোনাম: যে রসুল বলতে নয়ন ঝরে সেই রসুলের
যে রসুল বলতে নয়ন ঝরে সেই রসুলের
প্রেমিক আমি।
চাহে আমার হৃদয়-লায়লী সে-মজনুরে দিবস-যামী॥
ফর্হাদ সে, আমি শিঁরি
ঐ নামের প্রেমে পথে ফিরি,
ঈমান আমার রইল কিনা জানেন তিনি অন্তর্যামী॥
প্রেমে তাঁর দীওয়ানা হ’য়ে গেল দুনিয়া আখের সবি,
কোথায় রোজা, কোথায় নামাজ, কেবল কাঁদি – ‘নবী নবী।’
রোজ-কেয়ামত আসবে কবে
কখন তাঁহার দিদার হবে,
নিত্য আমার রোজ-কেয়ামত বিনে জীবন-স্বামী॥
- ভাবসন্ধান: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর প্রেম, বিরহ, আত্মনিবেদন ও সাক্ষাৎ-আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। সুফি প্রেমের প্রতীক ও উপমার মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন যে, সত্যিকার নবীপ্রেম মানুষের অন্তরকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে যে, পার্থিব মোহ ম্লান হয়ে যায় এবং জীবনের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হয়ে ওঠে মহানবীর সান্নিধ্য ও দর্শন।
এই ধর্মাদর্শে এই গানে কবি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি এক নিবেদিত ভক্তের গভীর প্রেম, বিরহ ও আধ্যাত্মিক আকুলতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। সুফি-ভাবধারার প্রেমের ভাষায় তিনি দেখিয়েছেন যে, নবীপ্রেম তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুভূতি; এই প্রেমে তিনি নিজের পার্থিব জীবন, সুখ-দুঃখ এবং সমস্ত ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে বিলীন করে দিয়েছেন।
গানের শুরুতেই কবি বলেন, তিনি সেই মহানবীর প্রেমিক, যাঁর নাম উচ্চারণ করলেই তাঁর চোখে অশ্রু নেমে আসে। এই অশ্রু দুঃখের নয়; বরং গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও বিরহের আবেগের প্রকাশ। এরপর তিনি নিজের হৃদয়কে লায়লী এবং নিজেকে মজনুর সঙ্গে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ তাঁর হৃদয় সর্বক্ষণ মহানবীর প্রেমে নিমগ্ন এবং সেই প্রেমিকের সন্ধানে দিন-রাত ব্যাকুল।
গানের পরবর্তী অংশে কবি ফরহাদ ও শিরিন-এর কিংবদন্তির উল্লেখ করেন। তিনি নিজেকে শিরিন এবং মহানবীর প্রেমকে ফরহাদের প্রেমের মতো অনন্য ও আত্মত্যাগময় বলে কল্পনা করেছেন। তিনি বলেন, এই প্রেমে বিভোর হয়ে তিনি পথে পথে ঘুরে বেড়ান। তবে সঙ্গে সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করেন যে, তাঁর ঈমানের প্রকৃত অবস্থা একমাত্র আল্লাহই জানেন। অর্থাৎ তিনি নিজের ভক্তি নিয়ে অহংকার করেন না; বরং আত্মসমালোচনার মধ্যেই আল্লাহর বিচারের ওপর আস্থা রাখেন।
এরপর কবি বলেন, মহানবীর প্রেমে তিনি এমনভাবে আত্মহারা হয়েছেন যে, তাঁর কাছে দুনিয়া ও আখেরাতের সব আকাঙ্ক্ষাই তুচ্ছ হয়ে গেছে। “কোথায় রোজা, কোথায় নামাজ”—এই পংক্তিটি ইবাদতের গুরুত্ব অস্বীকার করার জন্য নয়; বরং নবীপ্রেমের আবেগে তাঁর হৃদয় এতটাই অভিভূত যে, তাঁর মুখে বারবার শুধু “নবী, নবী” ধ্বনি উচ্চারিত হয়। এটি সুফি কাব্যের অতিশয়োক্তিপূর্ণ ভক্তিভাষা, যেখানে প্রেমের তীব্রতাকে প্রধান করে প্রকাশ করা হয়েছে।
গানের শেষাংশে কবি কিয়ামতের দিনের জন্য আকুল অপেক্ষার কথা বলেন। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, সেই দিন তিনি মহানবীর সাক্ষাৎ (দিদার) লাভের আশা করেন। কিন্তু তাঁর কাছে প্রতিটি দিনই যেন কিয়ামতের দিনের মতো দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও ব্যাকুলতায় ভরা। প্রিয় নবীর দর্শন ছাড়া তাঁর জীবন অসম্পূর্ণ এবং অর্থহীন বলে মনে হয়। তাই তিনি বলেন, নবীকে ছাড়া তাঁর প্রতিটি দিনই এক একটি ব্যক্তিগত কিয়ামত।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের
মে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৫)
টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির
প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ১১ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৭১৯। পৃষ্ঠা:
৫১২]
- রেকর্ড: টুইন [মে ১৯৩৯ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ
১৩৪৫)। এফটি ১২৮০৯। শিল্পী: আব্দুল লতিফ]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসালম। নাত-এ রসুল