বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: লহ সালাম লহ, দ্বীনের বাদশাহ, জয় আখেরি নবী
লহ সালাম লহ, দ্বীনের বাদশাহ, জয় আখেরি নবী।
পীড়িত জনগণে মুক্তি দিতে এলে হে নবীকুলের রবি॥
তুমি আসার আগে ধরার মজলুম
করিত ফরিয়াদ, চোখে চিল না ঘুম,
ধরার জিন্দানে, বন্দী ইনসানে আজাদি দিতে এলে হে প্রিয় আল-আরবি॥
তব দামন ধরি’ যত গোনাহগার,
মাগিল আশ্রয়, তুমিই করিবে পার।
মানুষ ছিল আগে বন্য পশু প্রায়
কাঁদিত পাপে তাপে অভাব ও বেদনায়,
শান্তি-দাতা রূপে সহসা এলে তুমি ফুটিল দুনিয়াতে নব বেহেশ্তের ছবি॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে মানবমুক্তির মহান পথপ্রদর্শক, শান্তি ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং ইসলামের সর্বশেষ নবী হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে। তাঁর আবির্ভাবের ফলে অজ্ঞতা, অন্যায় ও নিপীড়নের অন্ধকার দূর হয়ে মানবসমাজে ন্যায়, সাম্য, দয়া ও শান্তির এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল—এই ভাবই গানের মূল প্রতিপাদ্য। এই
আদর্শে রচিত এই গানে কবি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে মানবমুক্তির দূত, শান্তির বার্তাবাহক এবং ইসলামের সর্বশেষ নবী হিসেবে গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে অভিবাদন জানিয়েছেন।
গানের শুরুতে কবি মহানবী (সা.)-কে সালাম জানিয়ে তাঁকে ‘দ্বীনের বাদশাহ’ ও ‘আখেরি নবী’ বলে সম্বোধন করেছেন। এখানে ‘দ্বীনের বাদশাহ’ বলতে পার্থিব রাজত্ব নয়, বরং ইসলামের আদর্শ, সত্য ও নৈতিকতার সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বোঝানো হয়েছে। কবি বলেন, তিনি পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির জন্য। তাঁর আবির্ভাব ছিল মানবজাতির জন্য আলোর সূর্যোদয়ের মতো।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি ইসলাম-পূর্ব আরব ও সমকালীন বিশ্বের অবস্থার একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। সে সময় সমাজে অন্যায়, অত্যাচার, বৈষম্য ও অজ্ঞতার প্রাধান্য ছিল। দুর্বল ও মজলুম মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় আর্তনাদ করত, কিন্তু তাদের দুঃখ মোচনের কেউ ছিল না। মানবসমাজ যেন এক বিশাল কারাগারে বন্দি ছিল। মহানবী (সা.) সেই বন্দিদশা থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে এবং তাদের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ন্যায়ভিত্তিক জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে আবির্ভূত হন।
এরপর কবি বলেন, যত পাপী ও অপরাধী মহানবী (সা.)-এর আশ্রয় প্রার্থনা করেছে, তিনি তাদের সৎপথের দিশা দেখিয়েছেন। এখানে তাঁর ক্ষমাশীলতা, দয়া ও মানবকল্যাণমুখী চরিত্রের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তিনি মানুষকে হতাশ করেননি; বরং আল্লাহর ক্ষমা ও হেদায়েতের পথে আহ্বান করেছেন।
গানটির শেষ স্তবকে কবি ইসলাম-পূর্ব সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের কথা স্মরণ করেন। মানুষ তখন প্রায় বন্য পশুর মতো হিংস্র, নিষ্ঠুর ও নীতিহীন জীবনযাপন করত। পাপ, দুঃখ, অভাব ও অশান্তিতে পৃথিবী ভারাক্রান্ত ছিল। এমন সময়ে মহানবী (সা.) শান্তি, ন্যায়, ভ্রাতৃত্ব, দয়া ও মানবতার বাণী নিয়ে আবির্ভূত হন। তাঁর শিক্ষা ও আদর্শে পৃথিবীতে যেন নতুন এক জান্নাতের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে—যেখানে মানুষের মর্যাদা, সাম্য, ন্যায়বিচার ও শান্তির আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪২)
মাসে, টুইন গানটির রেকর্ড করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৩৬ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২)। ১৭৪১ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৫১৮।
- রেকর্ড: টুইন [অক্টোবর ১৯৩৫ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪২)। এফটি ৪১০৮। শিল্পী:
গণি মিঞা (ধীরেন দাস)]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের সুর