বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: সাহারাতে ডেকেছে আজ বান, দেখে যা
সাহারাতে ডেকেছে আজ বান, দেখে যা।
মরুভুমি হ'ল গুলিস্তান, দেখে যা॥
সেই বানেরই ছোঁয়ায় আবার আবাদ হল দুনিয়া,
শুকনো গাছে মুঞ্জরিল প্রাণ দেখে যা॥
বিরান মুলুক আবার হল গুলে গুলে গুলজার,
মক্কাতে আজ চাঁদের বাথান, দেখে যা॥
সেই দরিয়ায় পারাপারের তরি ভাসে কোরআন,
ওড়ে তাহে কলেমার নিশান, দেখে যা॥
কান্ডারি তার বন্ধু খোদার হজরত মোহাম্মদ,
যাত্রী যারা এনেছে ইমান, দেখে যা॥
সেই বানে কে ভাসবি রে আয়,
যাবি রে কে ফিরদৌস,
খেয়াঘাটে ডাকিছে আজান, দেখে যা॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে ইসলামের আবির্ভাবকে মরুভূমিতে নেমে আসা জীবনদায়ী বন্যার সঙ্গে তুলনা করে দেখানো হয়েছে যে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে মানবসমাজ অজ্ঞতা, পাপ ও নৈতিক শূন্যতা থেকে মুক্ত হয়ে ঈমান, সত্য, শান্তি ও কল্যাণের পথে পরিচালিত হয়েছে। কোরআন ও নবীর অনুসরণই মানুষের মুক্তি ও জান্নাত লাভের পথ—এই ভাবই গানের মূল প্রতিপাদ্য।
এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে কবি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের ফলে ইসলামের যে আধ্যাত্মিক জাগরণ ও মানবকল্যাণের নবধারা পৃথিবীতে প্রবাহিত হয়েছিল, তাকে মরুভূমিতে নেমে আসা জীবনদায়ী বন্যার রূপকে প্রকাশ করেছেন। এখানে ‘বান’ বা বন্যা ধ্বংসের প্রতীক নয়; বরং আল্লাহর রহমত, হেদায়েত ও ইসলামের জীবনদায়ী আদর্শের প্রতীক।
গানের শুরুতে কবি আহ্বান জানান—এসো, দেখে যাও সেই বিস্ময়কর দৃশ্য, যেখানে সাহারা মরুভূমিতে যেন জীবনের বন্যা নেমেছে। যে ভূমি ছিল অনুর্বর, নিষ্প্রাণ ও শুষ্ক, তা আজ ফুলে-ফলে ভরা বাগানে (গুলিস্তান) পরিণত হয়েছে। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে, মহানবী (সা.)-এর আগমনের আগে আরব ছিল অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত; কিন্তু ইসলামের আলো সেই সমাজকে নবজীবন দান করেছে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, এই জীবনদায়ী স্রোতের স্পর্শে সমগ্র পৃথিবী আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। যেমন শুকনো গাছে নতুন কুঁড়ি ও প্রাণের সঞ্চার হয়, তেমনি মৃতপ্রায় মানবসমাজও ইসলামের শিক্ষা ও নৈতিক আদর্শে পুনর্জীবিত হয়েছে। বিরান ও জনশূন্য ভূমিও ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ উদ্যানে পরিণত হয়েছে। মক্কা, যা একসময় সীমিত পরিসরের একটি মরু-নগরী ছিল, আজ তা আধ্যাত্মিক আলোর কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ‘চাঁদের বাথান’ উপমার মাধ্যমে কবি মক্কার পবিত্রতা, সৌন্দর্য ও ঐশী মহিমাকে কাব্যিকভাবে প্রকাশ করেছেন।
এরপর কবি ইসলামের পথকে এক বিশাল দরিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেই দরিয়ায় মানুষের মুক্তির নৌকা হলো পবিত্র কোরআন, যা মানুষকে সত্যের পথে পরিচালিত করে। নৌকার ওপর উড়ছে কলেমার নিশান, অর্থাৎ ইসলামের তাওহিদের পতাকা। এই নৌকার কাণ্ডারি বা মাঝি হলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.), যিনি আল্লাহর প্রিয় বন্ধু এবং যাঁর নেতৃত্বে ঈমানদাররা নিরাপদে মুক্তির তীরে পৌঁছায়।
গানের শেষাংশে কবি সবাইকে আহ্বান জানান, এই রহমতের স্রোতে নিজেদের সমর্পণ করতে। যে এই পথ অনুসরণ করবে, সে জান্নাতের (ফিরদৌসের) পথে অগ্রসর হবে। আজানের ধ্বনি যেন সেই মুক্তির ঘাটে দাঁড়িয়ে মানুষকে আহ্বান করছে। অর্থাৎ আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঈমান ও সৎকর্মের পথে চললেই চিরস্থায়ী কল্যাণ ও মুক্তি লাভ সম্ভব।
সারমর্ম:
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। '
গুলবাগিচা'
গীতি-সংকলনের প্রথম সংস্করণে [১৩ আষাঢ় ১৩৪০, ২৭ জুন ১৯৩৩] গানটি
প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ১ মাস
- গ্রন্থ:
-
গুলবাগিচা
- প্রথম সংস্করণ [১৩ আষাঢ় ১৩৪০, ২৭ জুন ১৯৩৩। হাম্বীর মিশ্র-কার্ফা। পৃষ্ঠা:
৯৭-৯৮]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা।
জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গুল-বাগিচা। গান সংখ্যা ৭৯। ইমন মিশ্র-পোস্তা।। পৃষ্ঠা ২৭৩-২৭৪]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৭৫৭]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল