বিষয়: নজরুলসঙ্গীত
শিরোনাম: সুন্দর হে, দাও দাও সুন্দর জীবন
সুন্দর হে, দাও দাও সুন্দর জীবন।
হউক দূর অকল্যাণ, সকল অশোভন॥
এ প্রাণ প্রভাতী-তারার প্রায়
ফুটুক উদয়-গগন-গায়,
দুঃখ নিশায় আন পূর্ণ চাঁদের স্বপন॥
সকল বিরস-হৃদয়-মন সরস কর হে,
আশার সূর্য্যে মৃত্যু-গহন বিপদ হর হে।
কাঁটার ঊর্ধ্বে ফোটাও ফুল
ভোলাও পথের দুঃখ ভুল,
এ বিশ্ব হোক পূজা-দেউল পবিত্র-মোহন॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে সুন্দর জীবনের প্রার্থনা এবং অশুভকে অতিক্রম করে বিশ্বকে সৌন্দর্য, পবিত্রতা ও মঙ্গলের আবাসে পরিণত করার আকাঙ্ক্ষা
উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে ‘সুন্দর’ কেবল বাহ্যিক রূপের সৌন্দর্য নয়; এটি মানুষের অন্তরের শুভতা, জীবনের কল্যাণ, হৃদয়ের প্রেম এবং বিশ্বের পবিত্রতার প্রতীক।
কবি পরম সৌন্দর্যের অধিকারী পরমসত্তার কাছে সুন্দর জীবনের প্রার্থনা করেছেন।
তাঁর কামনা শুধু ব্যক্তিগত সুখ নয়—জীবন থেকে যেন দূর হয়ে যায় সব অকল্যাণ,
কদর্যতা ও অশুভ শক্তি। অর্থাৎ মানুষের জীবন হয়ে উঠুক সত্য, মঙ্গল ও সৌন্দর্যের
আধার।
এগানে প্রভাতী তারা নতুন দিনের আশা ও আলোর প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কবি চান মানুষের প্রাণ অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে না গিয়ে নতুন সূর্যোদয়ের পূর্বাভাস হয়ে উঠুক। আবার দুঃখের নিশায় তিনি চান পূর্ণচন্দ্রের স্বপ্ন—অর্থাৎ জীবনের গভীর দুঃখ ও অন্ধকারের মধ্যেও যেন আশা, শান্তি ও সৌন্দর্যের আলো জেগে থাকে। মানুষের জীবন তাই কেবল সুখের অপেক্ষা নয়; দুঃখের মধ্যেও সৌন্দর্য ও আশার আলো খুঁজে পাওয়ার সাধনা।
এখানে কবি মানুষের শুষ্ক, ক্লান্ত ও আনন্দহীন হৃদয়কে প্রাণের রসে পূর্ণ করার প্রার্থনা করেছেন। ‘বিরস হৃদয়’ জীবনের হতাশা, ক্লান্তি ও নৈরাশ্যের প্রতীক; আর ‘সরস’ হওয়া মানে প্রেম, আনন্দ ও জীবনীশক্তিতে সজীব হয়ে ওঠা।
‘আশার সূর্য’ এখানে অন্ধকার দূর করার শক্তি। মৃত্যু, বিপদ ও গভীর হতাশার যে গহন অরণ্য মানুষকে গ্রাস করে, আশার আলো তা দূর করতে পারে। তাই আশা এখানে শুধু ভবিষ্যতের প্রত্যাশা নয়—এটি জীবনের অন্ধকারের বিরুদ্ধে মানুষের অন্তর্গত শক্তি।
“কাঁটার ঊর্ধ্বে ফোটাও ফুল
ভোলাও পথের দুঃখ ভুল,”- এই পঙ্ক্তিতে জীবনের গভীর সত্য প্রকাশ পেয়েছে। ফুল ও কাঁটা পাশাপাশি থাকে। জীবনেও দুঃখ, বাধা ও বেদনা আছে; কিন্তু কবির প্রার্থনা—সেই কাঁটার মধ্যেই যেন ফুল ফোটে।
অর্থাৎ দুঃখকে মুছে ফেলার চেয়ে তাকে অতিক্রম করে জীবনকে সুন্দর করে তোলাই এখানে মূল কথা। জীবনের পথ কণ্টকপূর্ণ হলেও মানুষের সামনে যেন সৌন্দর্য, আনন্দ ও আশার ফুল ফুটে থাকে।
কবির প্রত্যাশা- “এ বিশ্ব হোক পূজা-দেউল পবিত্র-মোহন॥”
গানটির ভাবের সর্বোচ্চ বিস্তার ঘটেছে এই পঙ্ক্তিতে। কবির প্রার্থনা আর ব্যক্তিজীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তিনি সমগ্র বিশ্বকে ‘পূজা-দেউল’ বা পবিত্র উপাসনালয়ে পরিণত দেখতে চান।
এখানে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ, প্রকৃতি ও জীবনের মধ্যে এক পবিত্র সৌন্দর্যের অনুভব রয়েছে। অর্থাৎ ধর্ম কেবল নির্দিষ্ট মন্দির বা উপাসনালয়ের মধ্যে আবদ্ধ নয়—সমগ্র বিশ্বই পবিত্র, সমগ্র জীবনই পূজার ক্ষেত্র।
- রচনাকাল: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় না। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (আশ্বিন ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ) মাসে প্রকাশিত
'চন্দ্রবিন্দু' সঙ্গীত-সংকলনে গানটি প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩২ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
-
চন্দ্রবিন্দু।
- প্রথম প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ১৯৩১
(আশ্বিন ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ)
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, চতুর্থ খণ্ড [জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮, মে ২০১১।
চন্দ্রবিন্দু। ৩৯। সরফর্দা-একতালা। পৃষ্ঠা: ১৮২]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
১৭৮১]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। প্রার্থনা