বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: দোলে নিতি নব রূপের ঢেউ-পাথার
দোলে নিতি নব রূপের ঢেউ-পাথার ঘনশ্যাম তোমারি নয়নে।
আমি হেরি যে নিখিল বিশ্বরূপ-সম্ভার তোমারি নয়নে॥
তুমি পলকে ধর নাথ সংহার-বেশ,
হও পলকে করুণা-নিধান পরমেশ।
নাথ ভরা যেন বিষ অমৃতের ভাণ্ডার তোমার দুই নয়নে॥
ওগো মহা-শিশু, তব খেলা-ঘরে
একি বিরাট সৃষ্টি বিহার করে,
সংসার চক্ষে তুমিই হে নাথ, সংসার তোমারি নয়নে॥
তুমি নিমেষে রচি নব বিশ্বছবি
ফেল নিমেষে মুছিয়া হে মহাকবি,
করে কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড বুবন-সঞ্চার তোমারি নয়নে॥
তুমি ব্যাপক ব্রহ্ম চরাচরে
জড় জীবজন্তু নারী-নরে,
কর কমল-লোচন, তোমার রূপ বিস্তার হে আমারি নয়নে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে কবি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের (ঘনশ্যাম) সর্বব্যাপী,
বিশ্বধারক ও বিশ্বনিয়ন্তা রূপের মহিমা-বৈচিত্র্য বর্ণনা করেছেন। ভক্তের উপলব্ধিতে ঈশ্বরের
নয়নের মধ্যেই সমগ্র সৃষ্টিজগতের অসীম রূপ, বৈচিত্র্য ও রহস্য প্রতিফলিত হয়।
তাঁর নয়নে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রূপের ঢেউ খেলে যায় এবং সেই নয়নের মধ্যেই ভক্ত
সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রকাশ দেখতে পান।
কবি বলেন, শ্রীকৃষ্ণ কখনও সংহারমূর্তি ধারণ করেন, আবার মুহূর্তের মধ্যেই অসীম
করুণার আধার হয়ে ওঠেন। তাঁর মধ্যেই যেমন কঠোরতা ও ধ্বংসের শক্তি আছে, তেমনি আছে
অমৃতসম দয়া ও মমতা। তাই তাঁর দুই নয়ন যেন বিষ ও অমৃত—উভয়েরই আধার।
ভগবান এক মহাশিশুর মতো আপন লীলাক্ষেত্রে এই
বিরাট বিশ্বসৃষ্টি পরিচালনা করেন। মানুষের চোখে যে সংসার দৃশ্যমান, তা আসলে
তাঁরই প্রকাশ; আবার সমগ্র সংসারও তাঁর চেতনার মধ্যেই অবস্থান করছে। তিনি এক
নিমেষে অসংখ্য বিশ্ব সৃষ্টি করতে পারেন এবং আবার এক মুহূর্তেই তা লয়ও করতে
পারেন। তাঁর সৃষ্টিশক্তি অপরিসীম; কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড তাঁর ইচ্ছাশক্তির দ্বারা
পরিচালিত হয়।
গানের শেষাংশে কবি উপলব্ধি করেন যে, শ্রীকৃষ্ণ কেবল কোনো নির্দিষ্ট রূপে সীমাবদ্ধ
নন; তিনি সমগ্র চরাচরে, জড় ও জীবের মধ্যে, নারী ও পুরুষের মধ্যে সমভাবে
বিরাজমান। ভক্তের অন্তর্দৃষ্টি জাগ্রত হলে তিনি সর্বত্র সেই পরম সত্তারই রূপ
প্রত্যক্ষ করেন। এভাবে গানটিতে ভক্তিরস, বিশ্বরূপ-দর্শন এবং ঈশ্বরের সর্বব্যাপী
ব্রহ্মস্বরূপের এক গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি প্রকাশ পেয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
কবি নজরুল ইসলাম
ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত
নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি,
পঁয়তাল্লিশতম খণ্ড,- অন্তর্ভুক্ত এই গানের সাথে উল্লেখ আছে- ১৯২৯
খ্রিষ্টাব্দের উমাপদ ভট্টাচার্যের কণ্ঠে 'হ্যায় ক্যয়া ক্যয়া জলওয়া ভরা হুয়া
ঘনশ্যাম তোমহারি আঁখো মে' হিন্দি ভজন শুনে সেই সুরে কবি গানটি রচনা করেন।
এই বিচারে গানটি রচনার সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩০।
- গ্রন্থ:
-
বনগীতি
- প্রথম সংস্করণ [১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ অক্টোবর (রবিবার ২৭ আশ্বিন
১৩৩৯)। ভজন। ভীমপলশ্রী-কার্ফা। পৃষ্ঠা ৩৬-৩৭]
।
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। পঞ্চম খণ্ড।
বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮
মে, ২০১১। বনগীতি। ২৩ সংখ্যক গান। ভজন। ভীমপলশ্রী-কার্ফা। পৃষ্ঠা: ১৯১-১৯২]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২]। গান সংখ্যা
১৯৫০। রাগ: ভীমপলশ্রী, তাল: কাহার্বা। পৃষ্ঠা: ৮৫৭।
- পত্রিকা:
- বেতার জগৎ [১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই জানুয়ারি
(বৃহস্পতিবার ২৯ পৌষ ১৩৩৮)।
স্বরলিপিকার: পঙ্কজকুমার মল্লিক। ২৮১: পৃষ্ঠা ]
- জয়তী [শ্রাবণ-আশ্বিন ১৩৩৮ (আগষ্ট-সেপ্টেম্বর ১৯৩১)]
- রেকর্ড:
- এইচএমভি [নভেম্বর ১৯৩২ (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৩৯)]। পি ১১৭৫৭ শিল্পী: ইন্দুবালা]
- টুইন [জুলাই ১৯৩৫ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৯৪২)। এফটি
৪০১৯। শিল্পী: ইন্দুবালা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
আহসান
মুর্শেদ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি,
পঁয়তাল্লিশতম খণ্ড, কবি নজরুল ইসলাম
ইনস্টিটিউট। জুন ২০১৮] গান সংখ্যা ১৪। পৃষ্ঠা: ৫৮- ৬১ [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। শ্রীকৃষ্ণ।
বন্দনা
- সুরাঙ্গ: গজলের সুরে ভজন