বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: নমো নটনাথ! এ নাট-দেউলে
নমো নটনাথ! এ নাট-দেউলে
কর হে কর তব শুভ চরণ-পাত।
তোমার সঙ্গীতে নৃত্য-ভঙ্গিতে
হউক হেথা নব জীবন সজ্ঞাত॥
তব প্রসাদের দেব-দেব হে আদি কবি,
বাক-মুখর হ’ল মূক এ ছায়া-ছবি,
আজি এ ছবি-পটে, তব মহিমা রটে,
আলো ছায়া দুলে স্বপন-রাঙা রাত॥
তব আশিসে হে মহেন্দ্র দিক আনি
অভিনব আশা প্রাণ এ রূপ-বাণী।
হৃদয়ে সকলের দাও হে ঠাঁই এর,
আনুক এ রূপ-লোকে নবীন প্রভাত॥
- ভাবসন্ধান:
এই গানে নাট্যকলার অধিপতি 'নটনাথ' তথা শিবের নটরাজ রূপের
প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, আত্মসমর্পণ ও আশীর্বাদ প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে। শিবের
নটরাজ রূপ বিশ্বনৃত্যের অধিপতি; তাঁকে নৃত্যকলার আদি গুরু, সঙ্গীত ও সৃষ্টির
চিরন্তন ছন্দের উৎস হিসেবে মানা হয়। তাই ‘নটনাথ’, ‘নটরাজ’, ‘নৃত্যেশ্বর’ প্রভৃতি
উপাধি শিবের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত। যদিও নাট্য ও লীলার প্রসঙ্গে শ্রীকৃষ্ণকেও
কখনও কখনও নট বা লীলানায়ক হিসেবে কাব্যে উল্লেখ করা হয়, কিন্তু ‘নটনাথ’ শব্দটির
প্রচলিত ও প্রধান অর্থ শিবের নটরাজ রূপ।
গানের শুরুতেই কবি নটনাথকে আহ্বান
জানিয়েছেন—হে নটনাথ, এই নাট-দেউলে
(নাট্যমন্দিরে) তুমি তোমার শুভ চরণ স্থাপন করো। তোমার সঙ্গীত ও নৃত্যের ঐশ্বরিক
শক্তিতে এই শিল্পাঙ্গন নবজীবনের স্পন্দনে জেগে উঠুক। তোমার কৃপায় জড় ও প্রাণহীন
শিল্পসৃষ্টি প্রাণময় হয়ে উঠুক এবং শিল্পের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে নতুন অনুভূতি,
সৌন্দর্যবোধ ও সৃজনশীল চেতনার জাগরণ ঘটুক।
কবি নটনাথকে 'আদি কবি' বলে সম্বোধন
করেছেন। কারণ, সকল সৃষ্টির মূলেই যে ছন্দ, সুর ও সৌন্দর্যের প্রকাশ—তার উৎস সেই
পরম সৃষ্টিশক্তি। তাঁর প্রসাদে যে নির্বাক, নিষ্প্রাণ ছায়াচিত্রও বাক্মুখর হয়ে
ওঠে; অর্থাৎ প্রযুক্তি ও শিল্পের মিলনে নীরব ছবি কথা বলতে শুরু করে, সঙ্গীত ও
বাণীর মাধ্যমে নতুন প্রাণ লাভ করে। এই ভাবের সঙ্গে বাংলা সবাক চলচ্চিত্রের
সূচনালগ্নের একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্রও দেখা যায়। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে
জলসা বাংলা ভাষায় নির্মিত প্রথম
দিকের সবাক চলচ্চিত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় এবং
Crown Talkie House -এ প্রদর্শিত
হয়। নির্বাক ছায়াচিত্রে শব্দ, গান, আবৃত্তি ও সংলাপের সংযোজনের মাধ্যমে
চলচ্চিত্রশিল্প যে নতুন যুগে প্রবেশ করেছিল, কবির দৃষ্টিতে সেটিও যেন নটনাথের
আশীর্বাদে শিল্পের নবজন্ম।
'আজি এ ছবি-পটে, তব মহিমা রটে/আলো ছায়া দুলে স্বপন-রাঙা রাত'—এই পংক্তিত দুটিতে কবি আধুনিক দৃশ্যশিল্পের সেই
সৌন্দর্যকেই অনুভব করেছেন। আলো-ছায়ার খেলায়, সঙ্গীতের মাধুর্যে ও অভিনয়ের আবেগে
শিল্প যেন এক স্বপ্নময় নতুন জগৎ সৃষ্টি করে, যেখানে নটনাথের সৃষ্টিশক্তির
প্রকাশ ঘটে। শেষে কবি প্রার্থনা করেছেন—নটনাথের
আশীর্বাদে এই নতুন শিল্পরূপ মানুষের হৃদয়ে স্থান লাভ করুক, এর মধ্যে নবীন আশা ও
প্রাণের সঞ্চার হোক। শিল্পের এই সৌন্দর্যের জগৎ মানবজীবনে নতুন প্রভাতের বার্তা
নিয়ে আসুক।
রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। গানটি
গীতি-শতদল
সঙ্গীত
সঙ্কলনের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৪১ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে (এপ্রিল
১৯৩৪)। এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ১১ মাস।
গ্রন্থ:
-
গীতি-শতদল
- প্রথম সংস্করণ [বৈশাখ ১৩৪১। এপ্রিল ১৯৩৪। ভজন]
- নজরুল রচনাবলী, পঞ্চম খণ্ড [বাংলা একাডেমী। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গীতি-শতদল।
গান সংখ্যা ৭৬। ভজন। পৃষ্ঠা ৩২৯]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
১৯৬৫। পৃষ্ঠা: ৫৯১]
পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দু ধর্ম। শাক্ত। শিব। প্রার্থনা