বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: পরম পুরুষ সিদ্ধ যোগী মাতৃভক্ত যুগাবতার
পরম পুরুষ সিদ্ধ যোগী মাতৃভক্ত যুগাবতার,
পরমহংস শ্রীরামকৃষ্ণ লহ প্রণাম নমস্কার।
জাগালে ভারত শ্মশান তীরে
অশিব-নাশিনী মহাকালীরে
মাতৃনামের অমৃত-নীরে বাঁচালে মৃত ভারত আবার॥
সত্যযুগের পুণ্য স্মৃতি আনিলে কলিতে তুমি তাপস,
পাঠালে ধরার দেশে দেশে ঋষি পূর্ণতীর্থ-বারি-কলস।
মন্দিরে মসজিদে গির্জায়
পূজিলে ব্রহ্মে সমশ্রদ্ধায়,
তব নাম মাখা প্রেম-নিতেকনে ভরিয়াছে তাই ত্রিসংসার॥
- ভাবসন্ধান: রামকৃষ্ণ পরমহংস-এর জন্মদিন উপলক্ষে নজরুল জন্মগ্রহণ
করেছিলেন। এই গানের মাধ্যমে রামকৃষ্ণ পরমহংস-কে যুগাবতার, সিদ্ধযোগী, পরমহংস এবং
বিশ্বমানবতার অগ্রদূত হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে। কবি তাঁর জীবন, সাধনা
ও ধর্মসমন্বয়ের আদর্শকে মানবজাতির আধ্যাত্মিক জাগরণ এবং ভারতের নবজীবনের উৎসরূপে
উপস্থাপন করেছেন।
গানের শুরুতে কবি তাঁকে 'পরম পুরুষ', 'সিদ্ধ যোগী', 'মাতৃভক্ত'
ও 'যুগাবতার' নামে অভিহিত করেছেন। এই
বিশেষণগুলোর মাধ্যমে রামকৃষ্ণের অসাধারণ আধ্যাত্মিক সাধনা, কালী-মাতার প্রতি তাঁর
গভীর ভক্তি এবং যুগধর্ম প্রতিষ্ঠায় তাঁর অনন্য ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা
হয়েছে। তিনি ছিলেন এমন এক সাধক, যিনি পরমসত্তাকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধির মাধ্যমে
মানবজীবনের সর্বোচ্চ সত্যকে প্রকাশ করেছিলেন।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেছেন, রামকৃষ্ণ এমন এক সময়ে
আবির্ভূত হয়েছিলেন, যখন ভারত আত্মিকভাবে জড়তা, কুসংস্কার ও পরাধীনতার অন্ধকারে
নিমজ্জিত ছিল। সেই নিস্তেজ অবস্থাকে কবি 'শ্মশান' -এর সঙ্গে তুলনা
করেছেন। রামকৃষ্ণ মহাশক্তির উপাসনার মাধ্যমে অশিব-নাশিনী মহাকালী-র
আরাধনা করে ভারতবাসীর অন্তরে নতুন প্রাণসঞ্চার করেছিলেন। তাঁর মাতৃনাম-স্মরণ ও
ভক্তির অমৃতধারা মৃতপ্রায় জাতিকে নতুন আশা, শক্তি ও আত্মবিশ্বাস দান করেছিল।
এরপর কবি রামকৃষ্ণের সাধনাকে সত্যযুগের পবিত্র আদর্শের
পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখিয়েছেন। তিনি তাঁর শিষ্যদের—বিশেষত স্বামী বিবেকানন্দ-সহ
অন্যান্য সন্ন্যাসীদের—বিশ্বের নানা দেশে পাঠিয়েছিলেন মানবসেবা, আধ্যাত্মিক জ্ঞান
ও সর্বধর্মসমন্বয়ের বাণী প্রচারের জন্য। 'পূর্ণতীর্থ-বারি-কলস'
রূপকটি বোঝায় যে, তাঁর শিষ্যরা পবিত্র তীর্থের জলের মতো জীবনদায়ী আধ্যাত্মিক
আদর্শ বিশ্বের সর্বত্র বহন করে নিয়ে গিয়েছিলেন।
গানের শেষাংশে কবি রামকৃষ্ণের সর্বধর্মসমন্বয়ের মহান আদর্শ তুলে ধরেছেন। তিনি
উপলব্ধি করেছিলেন যে, মন্দির, মসজিদ ও গির্জা—সব পথই একই পরম সত্যের দিকে পরিচালিত
করে। তাই তিনি সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছিলেন। তাঁর প্রেম,
সহিষ্ণুতা, মানবতা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির আদর্শ সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে
মানুষের হৃদয়কে ঐক্য, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে
শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের
জন্মশতবার্ষিকী পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যদিও তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৩৬
খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি (বুধবার, ৬ ফাল্গুন ১২৪২)। কিন্তু আয়োজকরা এই অনুষ্ঠান
করেছিলেন, ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মার্চ শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের
জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয়। এই উৎসবের জন্য এইচএমভি রামকৃষ্ণ সম্পর্কিত একটি
গানের রেকর্ড প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলে। এই রেকর্ডে নজরুলের রচিত এই গানটি
প্রকাশিত হয়েছিল।
১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল
(চৈত্র ১৩৪৩-বৈশাখ ১৩৪৪) মাসে,
এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ১০ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। ১৯৮৯ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা:
৫৯৮।]
- রেকর্ড:
- ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জুলাই (বৃহস্পতিবার, ৩১ আষাঢ়
১৩৪৪). এইচএমভি'র সাথে নজরুলের যে চুক্তি হয়েছিল, তাতে এই গানটির
উল্লেখ ছিল।
- এইচএমভি এপ্রিল ১৯৩৭
(চৈত্র১৩৪৩-বৈশাখ ১৩৪৪)। এন ৯৮৮৭। শিল্পী: যূথিকা রায় ও কমল দাশগুপ্ত]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। ব্যক্তি বন্দনা। রামকৃষ্ণ
পরমহংস