বিষয়:
নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
ফিরে এলো সেই কৃষ্ণাষ্টমী তিথি
ফিরে এলো সেই কৃষ্ণাষ্টমী তিথি, হে শঙ্খচক্রধারী!
তোমার মাভৈঃ অভয় আকাশবাণী, কেন নাহি শুনি? হে মুরারি!!
সেই ঘনঘটা দুর্যোগ-নিশি,
নিরাশা-আঁধারে ঢাকা দশদিশি;
গগনে তেমনি ঘোর দুন্দুভি বাজে, ঝরে তেমনি অশ্রু-বারি॥
আজো মানুষের আত্মা তেমনি কাঁদে আশা-যমুনার দুই পারে,
এ-পারে দেবকী ও-পারে যশোদা আজো ডাকে মুক্তির বিধাতারে।
আবার প্রেমের বংশী বাজাও,
এই হানাহানি হিংসা ভুলাও,
আর্ত-কলির গানের এ শেষ-কলি দাও শেস করে ব্যথাহারী॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে কাজী নজরুল ইসলাম শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীর পৌরাণিক ঘটনাকে সমকালীন মানবসমাজের সংকটের সঙ্গে যুক্ত করে শান্তি, প্রেম ও মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন। কৃষ্ণের জন্মের ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক কাহিনি এখানে কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; বরং যুগে যুগে মানবজাতির অন্ধকার, অন্যায় ও অত্যাচার থেকে মুক্তির এক চিরন্তন প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
গানের সূচনায় কবি বলেন, আবার কৃষ্ণাষ্টমীর পবিত্র তিথি ফিরে এসেছে। তিনি শঙ্খচক্রধারী বিষ্ণু-অবতার শ্রীকৃষ্ণকে আহ্বান জানিয়ে প্রশ্ন করেন- কোথায় সেই
'মাভৈঃ' (ভয় করো না) অভয়বাণী, যা একদিন ভীত-সন্ত্রস্ত পৃথিবীকে আশ্বস্ত করেছিল?
'মুরারি' (মুর নামক অসুরবিনাশী কৃষ্ণ) সেই রক্ষাকর আহ্বান আজকের বিপর্যস্ত পৃথিবীতে যেন আর শোনা যায় না। এই প্রশ্নের মাধ্যমে কবি তাঁর সময়ের অস্থিরতা, ভয় ও নৈরাশ্যের চিত্র তুলে ধরেছেন।
গানটির পরবর্তী অংশে কৃষ্ণজন্মের সেই দুর্যোগময় রাত্রির কথা স্মরণ করা হয়েছে। পৌরাণিক কাহিনিতে কৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন এক ঝড়-বৃষ্টিমুখর, অন্ধকারাচ্ছন্ন রাতে, যখন অত্যাচারী কংসের ভয়ে সমগ্র মথুরা আতঙ্কিত ছিল। কবি দেখিয়েছেন, সেই অন্ধকার যেন আজও কাটেনি। চারদিকে এখনও দুর্যোগ, যুদ্ধ, হিংসা, অশান্তি ও মানুষের অশ্রুধারা অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ অতীতের কংস আজ ভিন্ন ভিন্ন রূপে বর্তমান সমাজেও বিদ্যমান।
আজও মানুষের আত্মা আশা-যমুনার দুই তীরে কাঁদছে। এক তীরে দেবকী, অন্য তীরে যশোদা- এই দুই মাতৃরূপ এখানে দুই ধরনের মানবিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। দেবকী বন্দিত্ব, দুঃখ ও নিপীড়নের মধ্যে মুক্তির প্রত্যাশাকে নির্দেশ করেন; আর যশোদা ভালোবাসা, লালন-পালন ও মানবিক স্নেহের প্রতীক। উভয়েই যেন আজও সেই মুক্তিদাতার প্রতীক্ষায় আছেন, যিনি পৃথিবীতে ন্যায়, শান্তি ও প্রেম প্রতিষ্ঠা করবেন।
গানের শেষাংশে কবি কৃষ্ণের প্রতি আন্তরিক আবেদন জানান—তিনি যেন আবার তাঁর প্রেমের বাঁশি বাজান। কৃষ্ণের বাঁশি এখানে কেবল সংগীতের প্রতীক নয়; এটি প্রেম, সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও মানবঐক্যের আহ্বান। কবি চান, সেই বাঁশির সুরে মানুষের হানাহানি, বিদ্বেষ, হিংসা ও বিভেদ দূর হয়ে যাক। কলিযুগের এই দুঃখ, অশান্তি ও ব্যথার অবসান ঘটিয়ে কৃষ্ণ যেন মানবজাতিকে শান্তি ও মুক্তির পথে পরিচালিত করেন।
- রচনাকাল :
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে
আগষ্ট (মঙ্গলবার ১০ ভাদ্র ১৩৪৭) আকাশবাণী কলকাতার ত্রয়োদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কাজী নজরুল ইসলাম
'আকাশবাণী' নামক একটি 'গীতি-আলেখ্য' রচনা করেন। এই গীতি-আলেখ্যের
জন্যই নজরুল এই গানটি রচনা করেছিলেন। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ২ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি
নজরুল
ইনস্টিটিউট। তৃতীয়
সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮।
গান ২০১০। পৃষ্ঠা
৩০৩-৩০৪]
- পত্রিকা: বেতার জগৎ। বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ ১৭শ
সংখ্যা। শিরোনাম: আকাশ-বাণীর গান। গান সংখ্যা ১। পৃষ্ঠা: ২০।
- বেতার:
আকাশবাণী (গীতিকা)
- প্রথম প্রচার: ২৬ আগষ্ট, ১৯৪০
খ্রিষ্টাব্দ (মঙ্গলবার ১০ ভাদ্র ১৩৪৭)। কলকাতার খ। চতুর্থ অধিবেশন। সন্ধ্যা ৭.৪৫ থেকে ৮.২৯ মিনিট।
- সূত্র:
- বেতার
জগৎ। ১১শ বর্ষ ১৬শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৮৮৪
- The
Indian-listener
1940, Vol V, No 16. page 1253
- দ্বিতীয় প্রচার: ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দ (শনিবার ৯ ফাল্গুন
১৩৪৮)। কলকাতার খ। চতুর্থ
অধিবেশন। সন্ধ্যা ৭.৩০ থেকে ৮.০৯।
- সূত্র: The
Indian-listener
1942, Vol VII, No 4. page 51]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। জন্মাষ্টমী