বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: ব্রজ কুমার গিরিধারী শ্যাম কিশোর
ব্রজ কুমার গিরিধারী শ্যাম কিশোর
বনচারী নীলমণি প্রীতম মোর॥
কৃষ্ণ গোপাল লীলা-সুন্দর
রাধা মাধব নিরূপম নটবর
রস শেখর পরম মনোহর রস বিলাসী রাধিকার চিত-চোর॥
মদন মোহন বন্শীওয়ালা
গোকুল চন্দ নন্দ-লাল
পীত বসনধারী গলে বনমালা সেই কানুরে আমি দিয়েছি প্রেম-ডোর॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের নানাবিধ নাম, রূপ, গুণ ও লীলার স্মরণ করে তাঁকে পরম প্রেমিক, বিশ্বমোহন ও ভক্তহৃদয়ের অধিপতি হিসেবে বন্দনা করেছেন। প্রতিটি বিশেষণ কৃষ্ণের একটি বিশেষ দিকের পরিচয় বহন করে, আর শেষ পর্যন্ত ভক্তের আত্মসমর্পণ ও প্রেমের অটুট বন্ধনই গানের মূল বক্তব্য হয়ে উঠেছে।
গানের শুরুতেই কবি কৃষ্ণকে ব্রজকুমার, গিরিধারী, শ্যামকিশোর, বনচারী এবং নীলমণি নামে সম্বোধন করেছেন। এই নামগুলোর মাধ্যমে তাঁর বৃন্দাবনের রাখালবালক-রূপ, গোবর্ধনধারী বীররূপ, শ্যামবর্ণ কিশোরসৌন্দর্য এবং বনবিহারী লীলাময় রূপ একত্রে ফুটে উঠেছে। ভক্তের কাছে এই কৃষ্ণই পরম প্রিয়তম।
এরপর কবি কৃষ্ণের আরও কয়েকটি ঐশ্বর্যময় পরিচয় তুলে ধরেছেন। তিনি গোপাল, অর্থাৎ গোপ ও গরুর পালনকর্তা; লীলাসুন্দর, কারণ তাঁর সমগ্র জীবনই আনন্দময় লীলায় পরিপূর্ণ; রাধামাধব, কারণ রাধার সঙ্গে তাঁর প্রেম চিরন্তন ও অবিচ্ছেদ্য; এবং নটবর, কারণ তিনি প্রেম ও লীলার সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী। তিনি রসশেখর, অর্থাৎ প্রেমরসের সর্বোচ্চ উৎস, এবং সেই প্রেমরস বিলিয়ে তিনি রাধিকার হৃদয় জয় করেছেন। তাই তাঁকে রাধিকার চিতচোর বলা হয়েছে।
গানের পরবর্তী অংশে কৃষ্ণের সৌন্দর্য ও আকর্ষণের আরও কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি মদনমোহন, যাঁর রূপ কামদেবকেও মোহিত করে; বংশীবালা, যাঁর বাঁশির সুর সমগ্র সৃষ্টিকে প্রেমে উদ্বেলিত করে; গোকুলচন্দ ও নন্দলাল, যিনি গোকুলের আনন্দ এবং নন্দরাজের প্রিয় পুত্র। তাঁর পীতবসন ও গলাভরা বনমালা তাঁর লীলাময় সৌন্দর্যকে আরও মনোহর করে তুলেছে।
গানের শেষ পঙ্ক্তিতে ভক্ত তাঁর সর্বস্ব নিবেদন করেছেন। তিনি বলেন, এই কানুকে তিনি প্রেমের ডোরে বেঁধেছেন। এখানে কোনো বস্তুগত বন্ধন নয়, বরং ভক্তির প্রেমই সেই অদৃশ্য বন্ধন, যা সর্বশক্তিমান
কৃষ্ণকেও ভক্তের হৃদয়ে আবদ্ধ করে রাখে। এই ভাবটি বৈষ্ণব সাহিত্যের একটি মৌলিক তত্ত্ব- ঈশ্বর শক্তিতে নয়, ভক্তের নির্মল প্রেমেই বশীভূত হন।
মূলত এই গানে শ্রীকৃষ্ণের বহুমাত্রিক রূপ- রাখাল, প্রেমিক, লীলাময় ঈশ্বর, বিশ্বমোহন ও ভক্তবৎসল পরমাত্মা- অত্যন্ত মাধুর্যময় ভাষায় বন্দিত হয়েছে। গানের মূল ভাব হলো, ভক্তির নির্মল প্রেমই
কৃষ্ণকে লাভ করার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়; সেই প্রেমের বন্ধনেই কৃষ্ণ চিরকাল ভক্তের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত থাকেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই (আষাঢ়-শ্রাবণ
১৩৪৪) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির
প্রথম রেকর্ড করে। তবে রেকর্ডটি পরে প্রকাশিত হয়নি। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)।
২০৩৪ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৬১১।
- রেকর্ড: এইচএমভি [জুলাই ১৯৩৭ ( আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪৪)]। শিল্পী:
কুমারী রেণু বসু। রেকর্ডটি প্রকাশিত হয় নি।
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বন্দনা