বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: বঁধু আমার ভুবন ঘিরিল যখন ঘন বাদল ঝড়ে
বঁধু আমার ভুবন ঘিরিল যখন ঘন বাদল ঝড়ে
কাঁদিয়া উঠিল মন প্রাণ অভিসারে আসিবার তরে।
(মোর মনে হল কেহ নাই,
এই কৃষ্ণ আঁধার নিশীথে রাধার কৃষ্ণ ছাড়া কেহ নাই।)
বঁধু, দিনের আলোকে পাই নাই খুঁজে, কাঁদিয়া ফিরেছি
একা,
সব পথ যবে হারালো আঁধারে, তখন পাইনু দেখা।
হে পরম প্রিয়তম! বল মোরে বল
তব অভিসারে এসে সংসার-পথ চিরতরে শেয় হ’ল।
(যেন আর ফিরে নাহি যাই,
তুমি ছাড়া তব রাধা নিরাধার হয়ে যায় – যেন আর ফিরে
নাহি যাই!)
হে কিশোর বলেছিলে,
তুমি নিজেরে নিঙাড়ি’ আমারে মধুর রসময়ী রূপ দিলে!
বঁধু তাই জড়াইয়া ধরি
তুমি না ধরিলে সব সর মধু ধূলায় যায় যে ঝরি!
(বঁধু আনন্দ আর রয়না তখন নিরানন্দ হয় ত্রিভুবন,)
সব সাধ অবসাদ বিম্বাদ হয়,
(মূল) রস নাহি দিলে দেহ-তরু প্রেম-ফুল কি বাঁচিয়া
রয়?
প্রিয়তম হে! আর ভ্রমপথে ভ্রমিতে দিও না এই অভিসার
শেষে
মোরে বক্ষে লুকায়ে রেখো হে যদি খোঁজে ননদিনী এসে,
ব’লো অভাগিনী রাধা যমুনার জলে ডুবিয়া গিয়াছে ভেসে।
(ব’লো রাই আর নাই দেশে নিরুদ্দেশের বিরহিনী গেছে
হারায়ে নিরুদ্দেশে)
- ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি রাধার গভীর প্রেম, বিরহ, আত্মসমর্পণ এবং চিরমিলনের আকাঙ্ক্ষা মাধুর্যভক্তির এক অপূর্ব রূপে প্রকাশিত হয়েছে। এখানে বহির্জগতের ঝড়-অন্ধকার আসলে অন্তর্জগতের বিরহবেদনা ও আত্মিক অস্থিরতার প্রতীক। সেই অন্ধকার ভেদ করেই রাধা তাঁর পরমপ্রিয় শ্রীকৃষ্ণের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং আর কখনও তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চান না।
গানের শুরুতেই রাধা বলেন, যখন তাঁর চারপাশে ঘন কালো মেঘে পৃথিবী আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল এবং জীবনে দুঃখ, নিঃসঙ্গতা ও অনিশ্চয়তার ঝড় নেমে এল, তখন তাঁর হৃদয় কৃষ্ণের অভিসারে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। সেই কৃষ্ণঘন অন্ধকারে তিনি উপলব্ধি করলেন, শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া তাঁর আর কোনো আশ্রয় নেই। এখানে বাহ্যিক অন্ধকার মানুষের জীবনের দুঃসময় এবং কৃষ্ণ পরম আশ্রয় ও মুক্তির প্রতীক।
গানটির পরবর্তী অংশে রাধা বলেন, জীবনের আলোকোজ্জ্বল দিনগুলোতে তিনি কৃষ্ণকে খুঁজেও পাননি। কিন্তু যখন সংসারের সব পথ অন্ধকারে হারিয়ে গেল, তখনই তিনি তাঁর সাক্ষাৎ পেলেন। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, সুখ ও প্রাচুর্যের সময় মানুষ অনেক সময় পরমসত্তাকে ভুলে থাকে; কিন্তু দুঃখ, সংকট ও অসহায়তার মধ্যেই তাঁর প্রকৃত উপলব্ধি ঘটে। তাই রাধা প্রার্থনা করেন, কৃষ্ণের এই অভিসারের পর যেন আর তাঁকে সংসারের মায়াবন্ধনে ফিরে যেতে না হয়; কারণ কৃষ্ণবিহীন জীবন তাঁর কাছে সম্পূর্ণ নিরাশ্রয়।
এরপর রাধা স্মরণ করেন কৃষ্ণের সেই অমৃতবাণী, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে, নিজের সত্তাকে নিঙড়ে দিয়েই তিনি রাধাকে প্রেম ও রসময়তার সৌন্দর্যে পূর্ণ করেছেন। তাই রাধা উপলব্ধি করেন, তাঁর সমস্ত সত্তা কৃষ্ণপ্রদত্ত। কৃষ্ণের সান্নিধ্য ছাড়া সেই প্রেম, আনন্দ ও সৌন্দর্যের কোনো অস্তিত্ব নেই। যেমন বৃক্ষে মূলরস না থাকলে ফুল বাঁচে না, তেমনি কৃষ্ণের প্রেমরস ছাড়া রাধার জীবনও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। এখানে ‘দেহ-তরু’ মানুষের জীবন এবং ‘প্রেম-ফুল’ আত্মার প্রেমময় বিকাশের প্রতীক।
গানের শেষাংশে রাধার আত্মসমর্পণের আকাঙ্ক্ষা চরম পরিণতি লাভ করেছে। তিনি কৃষ্ণের কাছে মিনতি করেন, এই মিলনের পর যেন আর তাঁকে সংসারের ভ্রমপথে ফিরে যেতে না হয়। তিনি কৃষ্ণের বক্ষে চিরদিন আশ্রয় নিতে চান। এমনকি যদি ননদিনী বা অন্য কেউ তাঁকে খুঁজতে আসে, তবে কৃষ্ণ যেন বলে দেন—রাধা যমুনার জলে বিলীন হয়ে গেছে। এখানে যমুনায় বিলীন হওয়া শারীরিক মৃত্যুর ইঙ্গিত নয়; বরং সংসার-পরিচয় বিসর্জন দিয়ে কৃষ্ণপ্রেমে সম্পূর্ণ আত্মবিলয়ের প্রতীক। ‘রাই আর নাই দেশে’—এই উক্তির মাধ্যমে রাধা তাঁর পৃথক সত্তার অবসান ঘটিয়ে কৃষ্ণপ্রেমে চিরলীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষাই ব্যক্ত করেছেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে
কলকাতা
বেতার থেকে পালাকীর্তন অভিসার প্রচারিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৪২ বৎসর।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২০৩৭। পৃষ্ঠা: ৬৪৪]
- বেতার: পালাকীর্তন অভিসার। [১৯৪১]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধকৃষ্ণ-লীলা