বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: বঁধু সেদিন নাহিক আর
বঁধু সেদিন নাহিক আর।
যবে রাধার বিহনে আঁধার দেখিতে ত্রিভুবন সংসার॥
তার বেশের লাগিয়া দেশের ফুল যে আনিতে চয়ন করি।
নিতি বেশের লাগিয়া দেশের ফুল যে আনিতে চয়ন করি।
নিতি গোকুলের পথে, বনে, যমুনাতে বাঁমরি বাজাতে
হরি।
(‘রাধা, রাধা’ বলে ডাকিতে কতই ছলে হে রাধা ব’লে,
(আমরা সবই জানি, তোমার গুণের কথা সবই জানি সখা
হে)
আজ শত সে চন্দ্রাবলী নিয়ে কর ঢলাঢলি
কত অলি-গিলি ফের শ্যাম,
তাই যমুনার জলে লাজে ডুবিয়া মরেছে সখা,
যে বাঁশিতে নিতে রাধা নাম (সখা হে)
তুমি বলেছিলে হরি;
তুমি নীল তনু হ’লে স্মরিয়া রাধার নীলাম্বরী।
আজ গেছ ভুলে, সে সব কথা গেছে ভুলে,
অনেকের আছে অনেক যে নাথ, জানে এই সংসার
তোমা বিনা আর কেহ নাই সখা অভাগিনী রাধিকার॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে রাধার হৃদয়ের গভীর অভিমান, বিরহবেদনা, অতীত প্রেমের স্মৃতিচারণ এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাঁর অবিচল একনিষ্ঠতার করুণ প্রকাশ ঘটেছে। একসময় যে প্রেম ছিল একান্ত, নিবিড় ও আত্মনিবেদিত, আজ সেই প্রেমে পরিবর্তনের আভাস পেয়ে রাধার হৃদয় ব্যথায় বিদীর্ণ হয়েছে। তাঁর অভিযোগের অন্তরালে লুকিয়ে আছে অগাধ ভালোবাসা এবং প্রিয়তমকে হারানোর আশঙ্কা।
গানের শুরুতেই রাধা অতীতের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন, যখন তাঁকে ছাড়া শ্রীকৃষ্ণের কাছে সমগ্র ত্রিভুবনই অন্ধকার বলে মনে হতো। রাধার বিচ্ছেদে কৃষ্ণ ব্যাকুল হয়ে পড়তেন এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে জগৎ যেন অর্থহীন হয়ে যেত। কিন্তু আজ সেই দিন আর নেই। রাধার মনে হয়েছে, কৃষ্ণের সেই একনিষ্ঠ প্রেম যেন আর আগের মতো নেই।
গানটির পরবর্তী অংশে রাধা স্মরণ করেন, একসময় কৃষ্ণ তাঁর সাজসজ্জার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে সুন্দর ফুল সংগ্রহ করতেন। প্রতিদিন গোকুলের পথে, বৃন্দাবনের বনে এবং যমুনার তীরে বাঁশি বাজিয়ে নানা ছলে ‘রাধা, রাধা’ বলে তাঁকে ডাকতেন। সেই বাঁশির প্রতিটি সুর ছিল প্রেমের আহ্বান। কিন্তু আজ সেই প্রেমের রূপ বদলে গেছে। রাধা ব্যঙ্গের সুরে বলেন, এখন কৃষ্ণ বহু চন্দ্রাবলীর সঙ্গে ক্রীড়ায় মত্ত। তাই যে বাঁশি একদিন রাধার নাম উচ্চারণ করত, সে বাঁশিও যেন লজ্জায় যমুনার জলে ডুবে মরেছে। এখানে ‘চন্দ্রাবলী’ কেবল কৃষ্ণের অন্য প্রেমিকার প্রতীক নয়; বরং রাধার একচ্ছত্র প্রেমে ভাগ বসানো সকল পার্থিব আকর্ষণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতীক।
এরপর রাধা কৃষ্ণকে তাঁরই বলা পুরোনো কথাগুলো স্মরণ করিয়ে দেন। কৃষ্ণ বলেছিলেন, রাধার নীলাম্বরীর স্মরণে তিনিও নীলবর্ণ ধারণ করেছেন। অর্থাৎ তাঁদের প্রেম ছিল এমন এক আত্মিক ঐক্য, যেখানে একজনের পরিচয় অন্যজনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। কিন্তু আজ কৃষ্ণ যেন সেই প্রতিশ্রুতি ও সেই প্রেমের স্মৃতি বিস্মৃত হয়েছেন। এই উপলব্ধি রাধার অভিমানকে আরও গভীর করে তোলে।
গানের শেষাংশে রাধা নিজের অসহায় অবস্থার কথা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, পৃথিবীর অন্য মানুষের অনেক আশ্রয়, অনেক প্রিয়জন এবং অনেক অবলম্বন থাকতে পারে; কিন্তু তাঁর জীবনে কৃষ্ণ ছাড়া আর কেউ নেই। কৃষ্ণই তাঁর একমাত্র প্রিয়, একমাত্র নাথ এবং একমাত্র জীবনাধার। তাই কৃষ্ণের সামান্য পরিবর্তনও তাঁর কাছে অসহনীয়। এই উক্তির মাধ্যমে রাধার একান্ত আত্মসমর্পণ ও কৃষ্ণনির্ভরতার চরম প্রকাশ ঘটেছে।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪২) এইচএমভি গানটির রেকর্ড করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৩৬ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান
২০৪২। পৃষ্ঠা ৬১৫]
- রেকর্ড:
- টুইন [অক্টোবর ১৯৩৫ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪২)। এফটি ৪১০৩। শিল্পী
নারায়ণ দাস বসু।]
- পর্যায়:
- বিষয়াংশ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধাকৃষ্ণলীলা