বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: ভুবনময়ী ভবনে এসো সীমার মাঝে এসো
ভুবনময়ী ভবনে এসো সীমার মাঝে এসো
অসীমা।
ভক্ত মনের মাধুরী দিয়ে গড়িয়াছি মা তোমার
প্রতিমা॥
চিন্ময়ী গো ধর মৃন্ময়ীরূপ
কত যুগ মাগো জ্বলিবে পূজাধূপ
মানসপটে বোধন ঘটে হও চির আসীনা করুণাময়ী মা॥
সে কোন অতীতে সুদূর ত্রেতায় এসেছিলে মা অশিব
নাশিনী
আসিলে না আর ধূলির ধরায় দিলে না মা বর অমৃত
ভাষিণী।
কত যুগ গেল কত বরষ মাস
কত বিফল পূজা কত কাঁদন হুতাশ
জাগ যোগমায়া যোগনিদ্রা ভোল পুন বিশ্বে প্রচার
হোক্ তব মহিমা॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে কবি জগন্মাতাকে সীমাহীন মহাশক্তি ও করুণাময়ী দেবী হিসেবে কল্পনা করে তাঁকে মর্ত্যলোকে, ভক্তের হৃদয়ে এবং মানবসমাজের মধ্যে আবির্ভূত হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। দেবীর মৃন্ময় প্রতিমা নির্মাণের মধ্য দিয়ে ভক্ত তাঁর অসীম, চিন্ময় সত্তাকে সীমার মধ্যে উপলব্ধি করতে চেয়েছে। গানের অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষা হলো—দেবী যেন কেবল মাটির প্রতিমায় সীমাবদ্ধ না থেকে ভক্তের মানসলোকে চিরস্থায়ীভাবে অধিষ্ঠান করেন এবং তাঁর করুণায় জগৎকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করেন।
গানের শুরুতে কবি- ভূবনব্যাপী বিরাজমানা সেই অসীমা দেবীকে কবি সীমাবদ্ধ মর্ত্যজগতে আবির্ভূত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। ভক্ত
তাঁর ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের অপার মহিমাকে মনের মাধুরী দিয়ে গড়েছেন তঁর মৃন্ময় প্রতিমা।
এখানে মৃন্ময় প্রতিমা বাহ্যিক প্রতীকী রূপ, আর তার মধ্য দিয়ে ভক্ত অসীম, চিন্ময়ী দেবীর
প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করার আকাঙক্ষা পূরণ করার চেষ্টা করেছেন। তাই ভক্তের
প্রার্থনা- 'চিন্ময়ী গো ধর মৃন্ময়ীরূপ।' কবির আকাঙ্ক্ষা যেন চৈতন্যময়ী দেবী, মাটির প্রতিমার রূপ ধারণ করে
জগতে আবির্ভূত হন। ভক্তের প্রত্যাশা, যতদিন পূজার ধূপ জ্বলবে, যতদিন ভক্তির সাধনা চলবে, ততদিন
তিনি যেন কেবল মণ্ডপের প্রতিমা হয়ে না থাকেন। তিনি যেন ভক্তের মানসপটে বোধিত ও চির-অধিষ্ঠিতা থাকেন। এখানে
'বোধন' শুধু দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক বোধন নয়; ভক্তের অন্তরে দেবীশক্তির জাগরণের গভীরতর অর্থ
প্রকাশ করেছে।
গানের পরবর্তী অংশে কবি দেবীর ত্রেতাযুগের আবির্ভাবের কথা স্মরণ করেছেন।
যেখানে রামায়ণ-পরম্পরায় অশুভ বা অশিব শক্তির বিনাশিনী দেবীর আবির্ভাবের যে পৌরাণিক স্মৃতি রয়েছে। সেই সুদূর অতীতে দেবী এসেছিলেন, কিন্তু তারপর আর তিনি তেমনভাবে ধূলির পৃথিবীতে আবির্ভূত হন নি- এই আক্ষেপ
উপস্থাপিত হয়েছে ভক্তের বাণীতে। অবশেষে তাঁর প্রশ্ন ও আকুতি উপস্থাপিত হয়েছে-
দেবীর করূণাবঞ্চিত সন্তানের গ্লানিময় অভিব্যক্তিতে। আঁর আক্ষেপ- কত যুগ, কত বছর কেটে
গেছে; কত পূজার্ঘ নিবদিতে হয়েছে, কত প্রার্থনা ও আকুতি ব্যর্থ হয়েছে, তবু দেবীর প্রত্যাশিত আবির্ভাব ঘটে
নি।
শেষে কবি দেবীকে আবার 'যোগমায়া' ও 'যোগনিদ্রা' রূপে আহ্বান করেছেন।
যেমন যোগনিদ্রায় নিমগ্ন মহাশক্তি তাঁর নিদ্রা ভেঙে জাগ্রত হন এবং পুনরায় বিশ্বে তাঁর মহিমা প্রচারিত হয়।
ভক্ত মনে করেন পৃথিবী যখন অশুভ, অন্যায়, দুঃখ ও অস্থিরতায় আচ্ছন্ন, তখন দেবীশক্তির পুনর্জাগরণ প্রয়োজন। তাঁর আবির্ভাবেই অশুভের বিনাশ, শুভের প্রতিষ্ঠা এবং মানবসমাজের কল্যাণ সম্ভব।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪২) মাসে, টুইন কোম্পানি গানটির রেকর্ড
প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৩৬ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন
২০৫০। গান ২০৫০। পৃষ্ঠা ৬১৭]
- রেকর্ড: টুইন [অক্টোবর ১৯৩৫ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪২)। এফটি ৪১০১। শিল্পী:
মাতৃপূজারীর দল (রেণু বসু ও দেবেন বিশ্বাস)]
- বেতার
:
মা এল রে
[গীতিনকশা]। রচয়িতা: হিমাংশু দত্ত। কলকাতা বেতারকেন্দ্র-ক। চতুর্থ অধিবেশন। ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪০ [শনিবার, ১২ আশ্বিন ১৩৪৭] সান্ধ্য অনুষ্ঠান। সময়: ৮-৮.৩৯
- সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ, ১৮শ সংখ্যা। ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪০। পৃষ্ঠা:
১০০২
-
The
Indian-listener
1940, Vol V, No 18. page 1429
স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম, শাক্ত। দূর্গা।
প্রার্থনা
- সুরাঙ্গ: ভজন