বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মদনমোহন শিশু নটবর
মদনমোহন শিশু নটবর শ্যামল সুন্দর যশোদা-দুলাল
নেচে নেচে চলে মঞ্জু চরণতলে বাজে সুমধুর মণি-মঞ্জির তাল॥
সেই সুন্দরেরই অনুরাগে
ধরণীতে উৎসব লাগে
সাগর-তরঙ্গে হিল্লোল জাগে সাথে তার মাতে নৃত্যে মহাকাল॥
কোটি গ্রহতারা ভানু আলোকিত ধেনু
আসে গগন-গোঠে শুনি তা’র বেণু,
নাচে দিবা-শ্বেত-রাজহংসী তিমির-কেকা নাচে শুনি তার বংশী,
পায়ে হয় বৃষ্টি অনন্ত সৃষ্টি শোভে নব জীবনে মৃত কঙ্কাল॥
- ভাবসন্ধান: শিশু কৃষ্ণের রূপ, নৃত্য ও বাঁশির সুরের মধ্য দিয়ে বিশ্বজগতের প্রাণময় হয়ে ওঠা। তিনি একই সঙ্গে যশোদার আদরের শিশু এবং মহাবিশ্বের প্রাণদাতা। তাঁর সৌন্দর্য ও প্রেমে পৃথিবী আনন্দিত হয়, প্রকৃতি নৃত্য করে এবং মৃত জগতেও নতুন জীবনের সঞ্চার ঘটে।
এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে- শিশু কৃষ্ণের অপরূপ সৌন্দর্য, তাঁর বাঁশির মোহিনী শক্তি এবং তাঁর সঙ্গে সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতির আনন্দময় একাত্মতা প্রকাশ পেয়েছে। কবি কৃষ্ণকে একদিকে যশোদার আদরের শিশু, অন্যদিকে সমগ্র সৃষ্টির প্রাণ ও নিয়ন্তা হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
গানের শুরুতে কৃষ্ণের বাল্যরূপ ও নটবর সত্তা ফুটে উঠেছে। তিনি যশোদার দুলাল, শ্যামল-সুন্দর শিশু। নেচে নেচে তাঁর চলার সময় পায়ের মণিমঞ্জীরের মধুর ধ্বনি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই শিশুরূপের মধ্যেই এমন এক আকর্ষণ রয়েছে যে, তাঁর সৌন্দর্যে পৃথিবী যেন উৎসবে মেতে ওঠে।
কৃষ্ণের সৌন্দর্যের প্রভাবে শুধু মানুষ নয়, সমগ্র প্রকৃতি ও বিশ্বজগৎ আন্দোলিত হয়ে ওঠে। তাঁর অনুরাগে ধরণীতে উৎসবের আবহ সৃষ্টি হয়, সমুদ্রের তরঙ্গে হিল্লোল জাগে এবং তাঁর নৃত্যের সঙ্গে যেন “মহাকাল” পর্যন্ত নৃত্যে মেতে ওঠে। অর্থাৎ, কৃষ্ণের আনন্দ ও সৌন্দর্য কোনো সীমাবদ্ধ জগতের বিষয় নয়—তা মহাবিশ্বব্যাপী।
এরপর কৃষ্ণের বাঁশির অলৌকিক শক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর বেণুর সুর শুনে কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্র, সূর্য, ধেনু—সব যেন গগনের গোঠে ছুটে আসে। দিন ও রাতের প্রতীকরূপে শ্বেত রাজহংসী ও অন্ধকারের ময়ূর পর্যন্ত সেই বাঁশির সুরে নৃত্য করে। এখানে কবি কল্পনার সাহায্যে বোঝাতে চেয়েছেন যে কৃষ্ণের বাঁশির সুরে জড় ও জীব, আলো ও অন্ধকার, পৃথিবী ও আকাশ—সবকিছুই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
গানের শেষাংশটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ—
“পায়ে হয় বৃষ্টি অনন্ত সৃষ্টি / শোভে নব জীবনে মৃত কঙ্কাল।” কৃষ্ণের চরণস্পর্শে যেন অনন্ত সৃষ্টির বৃষ্টি নামে। তাঁর উপস্থিতি মৃত ও নিষ্প্রাণ জগতের মধ্যেও নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। “মৃত কঙ্কাল”-এর মধ্যে “নব জীবন” ফুটে ওঠা তাই কৃষ্ণকে সৃষ্টির প্রাণশক্তি ও পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪২)
এইচএমভি
রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড করেছিল। শিল্পী ছিলেন মিস্ সরযূ। রেকর্ডটি পরে বাতিল হয়ে যায় এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর
১ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২০৫৬। 'জাতের জাঁতিকল'। পৃষ্ঠা: ৬১৯]
-
সন্ধ্যামালতী
- প্রথম সংস্করণ [শ্রাবণ ১৩৭৭ (জুলাই-আগষ্ট ১৯৭১)] গান সংখ্যা ১৩৭। পৃষ্ঠা:
৭৮-৮৯]
- নজরুল রচনাবলী জন্মশতবার্ষিকী সপ্তম খণ্ড [১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৫, ২৫ মে ২০০৮।
সন্ধ্যামালতী, গান ১১৫। পৃষ্ঠা: ১৮৬]
-
নজরুলের হারানো গানের খাতা সংখ্যা [নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা। আষাঢ় ১৪০৪/জুন ১৯৯৭। গান ১১৮।
for Ascharjamol (HMV)। ভজন।
পৃষ্ঠা: ১৪৫]
- রেকর্ড:
এইচএমভি [জুলাই ১৯৩৫
(আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪২)। শিল্পী: আশ্চর্যময়ী। রেকর্ডটি পরে
বাতিল হয়ে যায়।]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বন্দনা