বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: মা তোর চরণ-কমল ঘিরে চিত্ত ভ্রমর বেড়ায় ঘুরে
মা তোর চরণ-কমল ঘিরে চিত্ত ভ্রমর বেড়ায়
ঘুরে’
(ওমা) সাধ মেটে না দেখে দেখে (যত) দেখি তত নয়ন ঝুরে॥
(ঐ) চরণ-চিহ্ন বক্ষে এঁকে
চরণ-পরাগ ধূলি মেখে,
গ্রহ তারায় লোকে লোকে (তার) নাম গেয়ে যাই সুরে সুরে॥
তোর চরণের ধূলি নিয়ে ললাটে মোর তিলক আঁকি।
ঐ চরণের পানে চেয়ে ধ্রুবতারা হল আঁখি।
তোর চরণের মৃদু যদি
পাই মা আমি নিরবধি
আমি, লক্ষ কোটি জনম নিয়ে বেড়াব ত্রিভুবন জুড়ে॥
- ভাবসন্ধান: মায়ের চরণে ভক্তের অনন্ত প্রেম, একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণ এবং জন্মজন্মান্তর ধরে তাঁর আশ্রয়ে থাকার আকাঙ্ক্ষা। ভক্তের কাছে মায়ের চরণই সকল সৌন্দর্য, পবিত্রতা ও মুক্তির উৎস। তাই তিনি তৃপ্তিহীন নয়নে সেই চরণ দর্শন করতে চান এবং তাঁর পদধূলিকে জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি বলে মনে করেন।
এই ভাবাদরশে রচিত এই গানে ভক্তের মাতৃচরণে গভীর প্রেম, একান্ত ভক্তি ও চিরস্থায়ী আশ্রয়লাভের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। ভক্তের কাছে মায়ের চরণই পরম পবিত্র, পরম সুন্দর এবং জীবনের সর্বোচ্চ সাধনার বস্তু।
গানের শুরুতেই কবি বলেছেন—
“মা তোর চরণ-কমল ঘিরে চিত্ত ভ্রমর বেড়ায় ঘুরে।” এখানে ভক্তের চিত্তকে ভ্রমরের সঙ্গে এবং মায়ের চরণকে পদ্মফুলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যেমন ভ্রমর মধুর আকর্ষণে পদ্মের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়, তেমনি ভক্তের মন মায়ের চরণসৌন্দর্যের আকর্ষণে সর্বদা সেখানে নিবিষ্ট থাকে। মায়ের চরণ যতই তিনি দেখেন, ততই তাঁর দেখার আকাঙ্ক্ষা বাড়ে; তৃপ্তি আসে না। বরং সেই অপরিসীম সৌন্দর্যে তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে।
গানটির পরবর্তী অংশে ভক্তের আত্মসমর্পণের গভীরতা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মায়ের চরণচিহ্ন নিজের বক্ষে এঁকে নিতে চান এবং তাঁর চরণরেণু বা পদধূলি শরীরে মেখে নিজেকে পবিত্র করতে চান। এরপর তিনি সেই পবিত্র চরণধূলির মহিমা নিয়ে গ্রহে-তারায়, লোকে-লোকে, অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মায়ের নাম গেয়ে বেড়াতে চান। এতে ভক্তের ব্যক্তিগত প্রেম বিশ্বজনীন ভক্তিতে বিস্তৃত হয়েছে। এরপর কবি বলেন, মায়ের চরণের ধূলি দিয়ে তিনি নিজের ললাটে তিলক আঁকবেন। এটি তাঁর আত্মপরিচয় ও ভক্তির প্রতীক—তিনি নিজেকে মায়ের সন্তান ও ভক্ত হিসেবে চিহ্নিত করতে চান। আবার—
“ঐ চরণের পানে চেয়ে ধ্রুবতারা হল আঁখি।”
এই পঙ্ক্তিতে ভক্তের দৃষ্টির একনিষ্ঠতার কথা বলা হয়েছে। ধ্রুবতারার মতো তাঁর চোখ স্থির হয়ে আছে মায়ের চরণের দিকে; অন্য কোনো আকর্ষণ তাঁকে সেখান থেকে বিচলিত করতে পারে না।
গানটির শেষাংশে ভক্তের আকাঙ্ক্ষা আরও গভীর ও চিরন্তন হয়ে উঠেছে। তিনি মায়ের চরণের মৃদু স্পর্শ বা চরণ-আশ্রয় যদি অনন্তকাল লাভ করতে পারেন, তবে লক্ষ কোটি জন্ম গ্রহণ করেও তাঁর কোনো দুঃখ থাকবে না। তিনি জন্মে জন্মে, ত্রিভুবন জুড়ে ঘুরে বেড়ালেও কেবল সেই মাতৃচরণকেই তাঁর জীবনের আশ্রয় হিসেবে ধারণ করতে চান।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি (মাঘ-ফাল্গুন
১৩৪৪) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির
প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ৮ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)।
২০৬৩ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৬২১।
- রেকর্ড: এইচএমভি [ফেব্রুয়ারি ১৯৩৮ (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৪৪)। এন ১৭০৪১। শিল্পী:
শৈলেন গাঙ্গুলী। সুর: কমল দাশগুপ্ত]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা। আত্মনিবেদন