বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম : মাগো আমি মন্দমতি তবু যে সন্তান তোরই
মাগো আমি মন্দমতি তবু যে সন্তান তোরই
(হায়) পুত্র বেড়ায় কাঙাল বেশে মা যার ভুবনেশ্বরী॥
তুই যে এত হানিস হেলা
(তবু) তোকেই ডাকি সারা বেলা
মার খেলে মা’র শিমুর মত মাগো তোকেই জড়িয়ে ধরি॥
মা হয়ে তুই কেমন করে কোল থেকে তোর দিলি ফেলে
(মাগো) কেন দিলি ধুলায় ফেলে?
(আমি) মন্দ এত হতাম না মা মায়ের স্নেহ-সুধা পেলে।
(মা) তোর উপরে অভিমানে দু’চোখ যায় যেদিক পানে
সেই দিকে তাই ধাই মা এখন মরণ-বাঁচন ভয় না করি॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটির অন্তর্নিহিত ভাব হলো অসহায়, পথভ্রষ্ট ও বঞ্চিত সন্তানের মায়ের প্রতি গভীর অভিমানমিশ্রিত প্রেম এবং সেই অভিমানের মধ্যেও মাতৃচরণে অবিচ্ছিন্ন আশ্রয়লাভের আকাঙ্ক্ষা। ভক্ত নিজেকে ‘মন্দমতি’ বা দুর্বলবুদ্ধি বলে স্বীকার করলেও তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি বিশ্বজননী মায়ের সন্তান। এই মাতৃসম্পর্কই তাঁর সমস্ত দুঃখ, অভিযোগ ও ভালোবাসার কেন্দ্র।
“মাগো আমি মন্দমতি, তবু যে সন্তান তোরই”—এই পঙ্ক্তিতে ভক্তের আত্মস্বীকারোক্তি ও আত্মমর্যাদা একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি নিজেকে জ্ঞানী, সাধক বা পুণ্যবান বলে দাবি করেন না। বরং নিজের দুর্বলতা স্বীকার করেন। কিন্তু তাঁর এক গভীর বিশ্বাস—তিনি যেমনই হোন, মায়ের সন্তান তো বটেই।
তাই পরের পঙ্ক্তিতে তাঁর বেদনা—
“পুত্র বেড়ায় কাঙাল বেশে, মায যার ভুবনেশ্বরী।”
যাঁর মা স্বয়ং বিশ্বজগতের অধীশ্বরী, সেই মায়ের সন্তান আজ পৃথিবীতে কাঙালের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই ভক্তের অভিমান প্রকাশিত হয়েছে। তিনি যেন মাকে প্রশ্ন করছেন—তুমি যখন সকল ঐশ্বর্যের অধিকারিণী, তখন তোমার সন্তান এত দুঃখী ও অসহায় কেন?
“তুই যে এত হানিস হেলা,
তবু তোকেই ডাকি সারা বেলা।”
মায়ের প্রতি ভক্তের অভিযোগ আছে—তিনি তাঁকে অবহেলা করেন, দুঃখ দেন। কিন্তু সেই অভিযোগ তাঁকে মায়ের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না। বরং যত কষ্ট পান, ততই তিনি মাকেই ডাকেন।
এরপর এসেছে অত্যন্ত সুন্দর উপমা—
“মার খেলে মায়ের শিমুলের মত, মাগো তোকেই জড়িয়ে ধরি।”
এর ভাব হলো—মায়ের কাছ থেকে আঘাত পেলেও সন্তান মাকে ছেড়ে যায় না; বরং আরও বেশি করে তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করে। শাস্তি, অভিমান বা কষ্ট—সবকিছুর পরেও মায়ের কাছেই সন্তানের চূড়ান্ত নিরাপত্তা।
গানের সবচেয়ে বেদনাময় প্রশ্ন—
“মা হয়ে তুই কেমন করে কোল থেকে তোর দিলি ফেলে?
কেন দিলি ধুলায় ফেলে?”
এখানে ‘ধুলায় ফেলে দেওয়া’ বলতে সংসারের দুঃখ, অপমান ও অসহায় অবস্থায় নিক্ষিপ্ত হওয়ার অনুভূতি বোঝানো হয়েছে। ভক্ত মনে করছেন, তিনি যেন মায়ের কোল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই কঠিন পৃথিবীতে পড়ে আছেন।
গানটির তাঁর পরবর্তী অংশ আরও তাৎপর্যপূর্ণ—
“আমি মন্দ এত হতাম না মা, মায়ের স্নেহ-সুধা পেলে।”
এখানে ভক্ত নিজের সমস্ত দুর্বলতা ও পাপের পেছনে মাতৃবিরহের কথা বলেছেন। তিনি যেন মাকে বলছেন—আমি যদি তোমার স্নেহ ও ভালোবাসার পূর্ণ আশ্রয় পেতাম, তবে হয়তো এত পথভ্রষ্ট হতাম না। এটি কেবল অভিযোগ নয়; এটি মাতৃস্নেহের জন্য এক অসহায় আকুলতা।
গানের শেষাংশে কবি বলেছেন—
“তোর উপরে অভিমানে দু’চোখ যায় যেদিক পানে,
সেই দিকে তাই ধাই মা এখন মরণ-বাঁচন ভয় না করি।”
এখানে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য প্রকাশিত হয়েছে। মায়ের ওপর অভিমান করলেও ভক্তের চোখ যেদিকেই যায়, তাঁর মন শেষ পর্যন্ত মায়ের কাছেই ফিরে আসে। তিনি অভিমানে দূরে যেতে চান, কিন্তু সেই দূরত্বও তাঁকে মায়ের সন্ধানেই ছুটিয়ে নিয়ে যায়।
“মরণ-বাঁচন ভয় না করি”—অর্থাৎ মায়ের সন্ধানে তিনি জীবনের সব ভয় অতিক্রম করতে প্রস্তুত। মৃত্যু হোক বা জীবন—কোনোটিই তাঁকে তাঁর মাতৃঅন্বেষণ থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের
মার্চ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৩)
মাসে, এইচএমভি
রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৪৩ বৎসর
৯ মাস।
-
গ্রন্থ:
নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান
২০৭০। পৃষ্ঠা ৬২৪
- রেকর্ড: এইচএমভি [মার্চ ১৯৪৩ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৯)।
এন ২৭৩৫৮। শিল্পী:
ভবানী দাস। সুর: সুবল দাশগুপ্ত ]
- পর্যায়:
- বিষয়াংশ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা। মাতৃরূপা