বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
মাগো তোমার অসীম মাধুরী
মাগো তোমার অসীম মাধুরী বিশ্বে পড়িছে
ছড়ায়ে।
তোমার আঁখির স্নিগ্ধ লাবনি ঝরিছে গগন গড়ায়ে॥
কুমুদে কমলে দীঘি সরোবরে
তোমার পূজাঞ্জলি থরে থরে,
তব অপরূপ রূপ বিহরে নিখিল প্রকৃতি জড়ায়ে॥
অরুণ কিরণে হেরি মা তোমারি মুখের অভয় হাসি;
নাচে আনন্দে নদী তরঙ্গ প্রাণে প্রাণে বাজে বাঁশি।
আগমনী গায় সৃষ্টি অশেষ
ধ্যান ভেঙে চায় হাসিয়া মহেশ
তোমারে পূজিতে পূজারিণী বেশ ধরণীরে দিল পরায়ে॥
-
ভাবসন্ধান: দেবীমায়ের অসীম সৌন্দর্য, স্নেহ ও মঙ্গলময় শক্তি সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। আকাশের স্নিগ্ধতা, ফুলের সৌন্দর্য, নদীর নৃত্য, সূর্যের অরুণকিরণ—সবকিছুই যেন মায়ের রূপের বিভিন্ন প্রকাশ।
সমগ্র সৃষ্টি তাই তাঁর আগমনী গান গায় এবং পৃথিবী নিজেই পূজারিণীরূপে সেজে তাঁকে পূজা করে। গানটির গভীরতম উপলব্ধি হলো-মা কেবল মন্দিরের প্রতিমায় নন; নিখিল প্রকৃতিই তাঁর রূপ, তাঁর মাধুর্য এবং তাঁর চিরন্তন পূজার অর্ঘ্য।
এই ভাবদর্শে রচিত এই গানে দেবীমায়ের অসীম সৌন্দর্য, মাধুর্য ও মঙ্গলময় উপস্থিতি সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে ছড়িয়ে আছে-
তাই উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে মা কেবল মন্দিরের প্রতিমায় সীমাবদ্ধ নন; আকাশ, আলো, ফুল, নদী, তরঙ্গ ও সমগ্র প্রকৃতিই তাঁর রূপ ও আনন্দের প্রকাশ। কবি বিশ্বপ্রকৃতিকে দেবীর এক বিরাট জীবন্ত পূজামণ্ডপ হিসেবে অনুভব করেছেন।
স্থায়ীর প্রথম পঙ্ক্তিতে বলা হয়েছে- 'মাগো তোমার অসীম মাধুরী বিশ্বে পড়িছে ছড়ায়ে'। এই পঙ্ক্তিতে বলা হয়েছে, মায়ের সৌন্দর্য ও মাধুর্য কোনো একটি স্থানে সীমাবদ্ধ নয়। সমগ্র সৃষ্টি তাঁর সৌন্দর্যের স্পর্শে স্নিগ্ধ ও মধুর হয়ে উঠেছে।
পরের পঙ্ক্তিতে বলা হয়েছে- 'তোমার আঁখির স্নিগ্ধ লাবণি ঝরিছে গগন গড়ায়ে'। এখানে আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা স্নিগ্ধ আলোকে কবি মায়ের চোখের লাবণ্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দেবীর দৃষ্টির মধ্যে যে করুণা ও শান্তি রয়েছে, প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যেও যেন সেই স্নিগ্ধতারই প্রকাশ।
গানের অন্তরাতে বলা হয়েছে- 'কুমুদে কমলে দীঘি সরোবরে,
তোমার পূজাঞ্জলি থরে থরে'- দীঘি ও সরোবরে ফুটে থাকা কুমুদ ও কমলকে কবি মায়ের উদ্দেশে সাজানো পূজাঞ্জলি হিসেবে কল্পনা করেছেন। অর্থাৎ প্রকৃতি নিজেই যেন প্রতিদিন দেবীর পূজা করছে।
ফুল এখানে শুধু সৌন্দর্যের বস্তু নয়; এগুলো প্রকৃতির পক্ষ থেকে দেবীর প্রতি ভক্তি ও নিবেদনের প্রতীক। 'তব অপরূপ রূপ বিহরে নিখিল প্রকৃতি জড়ায়ে'
অর্থাৎ দেবীর সৌন্দর্য যেন সমস্ত প্রকৃতিকে জড়িয়ে আছে। পাহাড়, নদী, ফুল, আকাশ, আলো- সবকিছুর
মধ্যেই তাঁর রূপ বিচরণ করছে। এখানে একটি গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি রয়েছে—প্রকৃতি ও দেবী পৃথক নন; প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্য দিয়েই তাঁর সৌন্দর্য উপলব্ধ হয়। তিনি বিশ্বব্যাপী শক্তি, আর দৃশ্যমান সৃষ্টি তাঁর সেই শক্তির রূপময় প্রকাশ।
সঞ্চারীতে কবি বলছেন- 'অরুণ কিরণে হেরি মা তোমারি মুখের অভয় হাসি' -ভোরের সূর্যের লালিমাময় আলোকে কবি মায়ের মুখের অভয়হাসি হিসেবে দেখেছেন। অন্ধকারের পর যেমন ভোর আসে এবং পৃথিবী আলোকিত হয়, তেমনি মায়ের হাসি ভক্তের হৃদয়ের ভয় ও অন্ধকার দূর করে।
এই 'অভয়হাসি' কেবল সৌন্দর্যের নয়; এটি নিরাপত্তা, আশ্বাস ও মঙ্গলের প্রতীক। একই
সাথে কবি বলেছেন- 'নাচে আনন্দে নদী তরঙ্গ, প্রাণে প্রাণে বাজে বাঁশি।' অর্থাৎ নদীর তরঙ্গ যেন আনন্দে নৃত্য করছে এবং সমস্ত প্রাণের মধ্যে আনন্দের বাঁশি বেজে উঠেছে। অর্থাৎ দেবীর উপস্থিতিতে সমগ্র সৃষ্টি এক মহা-আনন্দোৎসবে মেতে উঠেছে।
এখানে প্রকৃতির প্রতিটি গতি ও সুরকে কবি দেবীর আগমন উপলক্ষে আনন্দের প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন।
আভোগে এসে কবির মনে হয়েছে- 'আগমনী গায় সৃষ্টি অশেষ'। অর্থাৎ সমগ্র সৃষ্টি
যেন দেবীর গাইছে আগমনী গান গাইছে। সাধারণত আগমনী গান গাওয়া হয় দেবী উমার পিতৃগৃহে আগমন উপলক্ষে। এখানে কবি সেই ধারণাকে বিশ্বজনীন রূপ দিয়েছেন- শুধু মানুষ নয়, সমগ্র সৃষ্টি যেন মায়ের আগমনী গান গাইছে।
অর্থাৎ দেবীর আগমন কোনো বিশেষ ঘরের ঘটনা নয়; তাঁর আবির্ভাব সমগ্র বিশ্বজগতের আনন্দের উৎস।
'ধ্যান ভেঙে চায় হাসিয়া মহেশ'- দেবীর রূপ ও আগমনের আনন্দে স্বয়ং মহেশ্বরও যেন ধ্যান ভেঙে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন। এটি দেবী ও শিবের চিরন্তন সম্পর্কের এক আনন্দময় চিত্র।
শেষ পঙ্ক্তিতে কবি বলছেন- 'তোমারে পূজিতে পূজারিণী বেশ ধরণীরে দিল পরায়ে।' এখানে ধরণী বা পৃথিবীকে পূজারিণীরূপে কল্পনা করা হয়েছে। পৃথিবী নিজেই ফুল, জল, আলো ও সৌন্দর্যের সাজে সজ্জিত হয়ে দেবীমায়ের পূজার জন্য প্রস্তুত হয়েছে।
অর্থাৎ মানুষ শুধু মায়ের পূজা করে না—সমগ্র প্রকৃতিই তাঁর পূজারিণী।
-
রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ১৮ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার, ১ আশ্বিন ১৩৪১ বঙ্গাব্দ), এইচএমভি
রেকর্ড কোম্পানির সাথে কয়েকটি গান প্রকাশের জন্য নজরুলের একটি চুক্তি হয়। এই
চুক্তিপত্রে এই গানটির উল্লেখ ছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫।
গান: ২০৭২]
- রেকর্ড:
- এইচএমভির
সাথে চুক্তিপত্র। [১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৫ (বুধবার, ১ আশ্বিন ১৩৪২)।
- এইচএমভি [অক্টোবর ১৯৩৫ (আশ্বিন-কার্তি ১৩৪২)। শিল্পী:
মৃণালকান্তি ঘোষ। রেকর্ডটি পরে বাতিল হয়ে গিয়েছিল]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা। বন্দনা