বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:মোরা ভেসে যাব কৃষ্ণ নামের স্রোতে গো
মোরা ভেসে যাব কৃষ্ণ নামের স্রোতে গো
ঐ নাম ধরে গো, উঠব মোরা ব্রজধামের পথে॥
ঐ নামেরই মন্ত্র গুণে
পথের মানুষ গোঠের বেণু শোনে গো
ভুলের কূলে কূলে কেলে যে সে ওঠে ফুলের রথে॥
ঐ নাম পেল যে, সুমুখে তার শ্যাম গো
দেখা দেবার তরে নিতুই ঘোরে অবিরাম গো।
ঐ কৃষ্ণ নামের টানে
ধীরে ধীরে প্রেম যমুনা আনে।
ঐ নামের গুণে গঙ্গাধারা নামে হিমগিরি হতে॥
- ভাবসন্ধান: কৃষ্ণনাম কেবল উচ্চারণের বিষয় নয়; তা ভক্তের অন্তরে প্রেম, আনন্দ ও আধ্যাত্মিক জাগরণ সৃষ্টি করে। এই নামের আশ্রয়ে মানুষ সংসারের ভ্রান্তি অতিক্রম করে কৃষ্ণপ্রেমের চিরআনন্দময় ব্রজধামের পথে অগ্রসর হয়।
এই ভাবদর্শে রচিত এই গানে- কৃষ্ণনামের মাহাত্ম্য, নামস্মরণের মাধ্যমে ভক্তির জাগরণ এবং প্রেমের পথে পরমপ্রিয় কৃষ্ণের কাছে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা
উপস্থাপিত হয়রছে। এখানে কৃষ্ণনামকে এমন এক পবিত্র ও শক্তিশালী স্রোতের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যার মধ্যে নিজেকে ভাসিয়ে দিলে মানুষ সংসারের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে ব্রজধামের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
ভক্তরা অভিমত- তাঁরা কৃষ্ণনামের স্রোতে ভেসে যাবেন এবং সেই নামকেই আশ্রয় করে ব্রজধামের পথে যাত্রা করবেন। এখানে ‘ব্রজধাম’ শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি কৃষ্ণপ্রেম, আনন্দ ও ভক্তির চিরন্তন আবাসের প্রতীক। কৃষ্ণনামই তাই ভক্তের পথের দিশারি এবং মুক্তির আশ্রয়।
এই নাম-মন্ত্রে এমন এক আধ্যাত্মিক শক্তি রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকেও নতুনভাবে জাগিয়ে তোলে। পথের মানুষ ও গোঠের মানুষও যেন সেই নামের মাধুর্যে কৃষ্ণের বাঁশির সুর শুনতে পায়। সংসারের ভুল, ভ্রান্তি ও মায়ার কূল থেকে মানুষ তখন ফুলের রথে আরোহণের মতো আনন্দময় ও পবিত্র জীবনের দিকে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ কৃষ্ণনামের প্রভাবে মানুষের অন্তর কলুষমুক্ত হয়ে সৌন্দর্য ও প্রেমের পথে উন্মুক্ত হয়।
কবি মনে করেন- যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে কৃষ্ণনাম লাভ করেছে, তার কাছে শ্যাম বা কৃষ্ণ আর দূরের কেউ নন। কৃষ্ণ যেন সর্বদা তার সম্মুখে এসে ধরা দেওয়ার জন্য অধীর হয়ে থাকেন। ভক্তের নামস্মরণ ও কৃষ্ণের করুণার মধ্যে এখানে এক গভীর পারস্পরিক সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে—ভক্ত নামের মাধ্যমে কৃষ্ণকে ডাকেন, আর কৃষ্ণও
সে ডাকে সাড়া দিয়ে ভক্তের কাছে নিজেকে প্রকাশ করতে সদা প্রস্তুত থাকেন।
কৃষ্ণনামের আকর্ষণে মানুষের হৃদয়ে ধীরে ধীরে প্রেম-যমুনা প্রবাহিত হয়। এই প্রেম প্রথমে ক্ষীণ হলেও ক্রমে তা গভীর ও প্রবল হয়ে সমগ্র সত্তাকে ভাসিয়ে নেয়। শেষ পঙ্ক্তিতে হিমগিরি থেকে গঙ্গাধারার নেমে আসার উপমার মাধ্যমে নামের মহিমাকে প্রকাশ করা হয়েছে। যেমন হিমালয়ের উচ্চ শিখর থেকে গঙ্গা নেমে এসে পৃথিবীকে পবিত্র ও সজীব করে, তেমনি কৃষ্ণনামের প্রভাবে মানুষের হৃদয়ে পবিত্র প্রেমের ধারা প্রবাহিত হয়।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল
সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন
১৩৪৮) মাসে, টুইন রেকর্ড
কোম্পানি প্রথম গানটির রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪২ বৎসর
৩ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২০৯৪। পৃষ্ঠা:
৬৩১]
- রেকর্ড:
টুইন [সেপ্টেম্বর ১৯৪১ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৮)। এফটি ১৩৬৪৫। শিল্পী:
পরাণ রায় ও মেনকা ব্যানার্জি। সুর: চিত্ত রায়]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। নাম-বন্দনা