বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: হে নাথ তোমায় দোষ দেব না
হে নাথ তোমায় দোষ দেব না আমারি সুখ সইল
না।
তুমি, চাওয়ার অধিক দিয়েছিলে আমার দোষেই রইল না
তা আমার দোষেই রইল না॥
তুমি আপন হাতে তিলে তিলে
আমার সুখের বাগান সাজিয়ে দিলে
মোর কপাল-দোষে ফুটল না ফুল (সেথা) মলয় হাওয়া বইল
না॥
সুখের দোসর সুখের সাথী তোমার আপন হাতের দান
সারা জীবন আমি তাদের করেছি নাথ অসম্মান।
নাথ, বৈরাগীর এ সইবে কেন
বিভব রতন বিলাস হেন
তারে ভিক্ষা ঝুলি দাও হে তুলি সোনার স্বর্গ লইল না
যে সোনার স্বর্গ লইল না॥
- ভাবসন্ধান: নিজের ভুলের জন্য গভীর অনুশোচনা। পরমশ্রষ্টা মানুষকে অনেক সময় তার চাওয়ার চেয়েও বেশি দেন।
উপহার দেন সুখ, ভালোবাসা, সম্পদ, সম্পর্ক ও জীবনের নানা সম্ভাবনা। কিন্তু মানুষ নিজের অহংকার, অবহেলা, অযোগ্যতা বা ভুল আচরণের কারণে সেই প্রাপ্তি নষ্ট করে ফেলে। তখন
পরমসত্তাকে দোষারোপ না করে নিজের অন্তরের দিকে ফিরে তাকানোই সত্য উপলব্ধি। এই
ভাবদর্শে রচিত এই গানে- পাওয়া যায় তার অকপট প্রকাশ। কবি পরম সত্তার কাছে অকপটে স্বীকার করছেন, তাঁর জীবনে যে সুখ এসেছিল, তা তিনি সহ্য বা ধারণ করতে পারেন নি। তাই নিজের দুঃখের জন্য
পরমসত্তাকে দায়ী করার কোনো কারণ নেই।
তিনি তাঁর প্রার্থনার চেয়েও বেশি দিয়েছেন। কিন্তু নিজের ভুল, অদূরদর্শিতা, অযোগ্যতা কিংবা দুর্ভাগ্যের কারণে সেই প্রাপ্তি স্থায়ী হয়নি। এখানে মানুষের একটি গভীর আত্মোপলব্ধি প্রকাশ পেয়েছে।
মানুষ জীবনে যা হারায়, তার সবটাই বাইরের ভাগ্যের দোষ নয়; নিজের ভুলও তার জন্য দায়ী।
পরমস্রষ্টা যেন অত্যন্ত যত্ন করে ধীরে ধীরে তাঁর জীবনে সুখের বাগান তৈরি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বাগানে সুখের ফুল ফুটল না, আনন্দের সুবাসও ছড়িয়ে পড়ল না। অর্থাৎ সম্ভাবনা ও প্রাপ্তি থাকা সত্ত্বেও
কবির নিজের ভাগ্য ও কর্মদোষে সেই সুখ পূর্ণতা লাভ করেনি।
গানটির পরের অংশে আরও গভীর অনুশোচনা প্রকাশ পেয়েছে। কবি মনে করেন, জীবনের আনন্দ ও সমৃদ্ধির সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল, যারা সুখের সহচর হয়ে এসেছিল, তারাও তাঁরই দান। কিন্তু কবি তাঁদের যথাযথ মর্যাদা দেননি; বরং নিজের আচরণেই সেই সম্পর্ক ও সুখ নষ্ট করেছেন।
গানের শেষাংশে ‘বৈরাগী’, ‘বিভব-রতন-বিলাস’, ‘ভিক্ষা-ঝুলি’ ও ‘সোনার স্বর্গ’-এর বৈপরীত্যের মাধ্যমে জীবনের এক গভীর সত্য প্রকাশ পেয়েছে। যে ব্যক্তি বৈরাগ্যের উপযুক্ত নয়, তার হাতে যদি বিপুল ঐশ্বর্য ও বিলাস দেওয়া হয়, সে তা ধারণ করতে পারে না। তাই
পরমসত্তার দেওয়া ‘সোনার স্বর্গ' ও তার কাছে টেকে না; সে যেন নিজের হাতে সেই স্বর্গ হারিয়ে ফেলে এবং শেষে ভিক্ষার ঝুলি নিয়েই পড়ে থাকে। এখানে ‘সোনার স্বর্গ’ শুধু ধনসম্পদের অর্থে নয়; প্রিয়জন, সুখ, সৌভাগ্য, ভালোবাসা, সংসারের আনন্দ—জীবনের মূল্যবান প্রাপ্তিরও প্রতীক।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় না।
১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪৩),
মাসে এইচএমভি
রেকর্ড কোম্পানি এই গানটির প্রথম রেকর্ড হয়েছিল। পরে তা বাতিল হয়ে যায়। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৩৭ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ
(নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ, ১৪১৭/ফেব্রুয়ারি, ২০১৪)। গান সংখ্য
২১৪৯। পৃষ্ঠা:
৬৪৭।
- রেকর্ড: এইচএমভি [জুলাই ১৯৩৬ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪৩)। শিল্পী: নারায়ণ দাস বসু। রেকর্ডটি পরে
বাতিল হয়ে যায়]
- পর্যায়:
- বিষয়াংশ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। অনুশোচনা