বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: বাঁশি কে বাজায় বনে আমি চিনি আমি চিনি
বাঁশি কে বাজায় বনে আমি চিনি আমি চিনি,
কলসে কাঁকন চুড়ি তাল দিয়ে কয় গো রিনিঝিনি।
আমি চিনি আমি চিনি॥
বুঝি গো বন পাপিয়া তারেই দেখে
'চোখ গেল, চোখ গে' বলে উঠে ডেকে।
ও বাঁশি বাজলে 'লে যাস্নে', (ও বৌ যাসনে)
বলে
'ননদিনী' 'ননদিনী'। আমি চিন আমি চিনি॥
মোর সেই বাঁশুরিয়ায় চেনে পড়ার পড়শিরা
চেনে তায় যায় যমুনায় গো যত প্রেমের গরবীরা।
সে যে মোর ঘর জ্বালানো পর ভুলানো
আমার কালো বরণ গো, তমালের ডাল দুলানো।
মন কয় আমায় নিয়ে গো সেই ত খেলে ছিনিমিনি॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে এক প্রেমমুগ্ধ গোপিনীর হৃদয়ে শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুর যে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে, তারই সজীব ও কাব্যিক প্রকাশ ঘটেছে। বাঁশির সুর শুনেই তিনি নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারেন-
এ সুর আর কারও নয়, তাঁর প্রিয়তম কৃষ্ণেরই। তাই তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন,
'আমি চিনি, আমি চিনি।' এই চেনা কেবল শ্রবণের পরিচয় নয়; এটি হৃদয়ের পরিচয়। সত্যিকার প্রেমিক-প্রেমিকা পরস্পরকে বাহ্যিক পরিচয়ে নয়, অন্তরের অনুভবে চিনতে পারেন।
বাঁশির সুর বনের নীরবতা ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গোপিনীর হাতে থাকা কলস, কাঁকন ও চুড়ির রিনিঝিনি ধ্বনিও যেন সেই সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওঠে। এতে বোঝা যায়, কৃষ্ণের বাঁশি শুধু মানুষের হৃদয় নয়, তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, চলাফেরা এবং চারপাশের জড়-চেতন সবকিছুকেই আন্দোলিত করে। প্রেমের স্পর্শে সাধারণ ঘটনাও তখন সংগীতের মতো মধুর হয়ে ওঠে।
এরপর কবি প্রকৃতিকে এই প্রেমের সহযাত্রী হিসেবে চিত্রিত করেছেন। বনপাপিয়া পাখি যেন কৃষ্ণকে দেখে উৎফুল্ল হয়ে ডাকছে-
'চোখ গেল, চোখ গেল।' এই লোকপ্রচলিত পাখির ডাককে কবি রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন। আবার বাঁশির সুর শুনে ঘরের বধূদের সতর্ক করা হয়-
'যাসনে', কারণ এই সুরে যে আকর্ষণ আছে, তা সংসারের সব বন্ধন ভেঙে মানুষকে টেনে নিয়ে যেতে পারে।
'ননদিনী' শব্দের পুনরাবৃত্তি গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল পরিবেশ এবং হাস্যরসকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
গানেরত পরবর্তী অংশে গোপিনী বলেন, তাঁর সেই বাঁশিওয়ালাকে শুধু তিনি নন, পাড়ার সবাই চেনে। বিশেষ করে যমুনাতীরে জল আনতে যাওয়া প্রেমময়ী গোপিনীরা তাঁকে দেখলেই চিনে ফেলে। অর্থাৎ কৃষ্ণের আকর্ষণ ব্যক্তিগত নয়; তাঁর প্রেমমাধুর্য সকলের হৃদয়কে সমানভাবে স্পর্শ করে। তবে প্রত্যেক ভক্তের কাছে সেই সম্পর্ক আবার একান্ত ব্যক্তিগতও বটে।
গানের শেষাংশে গোপিনী কৃষ্ণকে 'ঘর জ্বালানো, পর ভুলানো' বলে উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ, কৃষ্ণের প্রেম সংসারের মোহ, স্বার্থ ও পার্থিব আসক্তিকে জ্বালিয়ে দেয় এবং মানুষকে ঈশ্বরপ্রেমে আত্মবিস্মৃত করে। তাঁর শ্যামবর্ণ রূপ তমালবৃক্ষের দোলায়মান ডালের মতো মোহনীয়। সেই রূপের আকর্ষণে গোপিনীর মন অস্থির হয়ে ওঠে এবং মনে হয়, কৃষ্ণ যেন তাঁর মনকে নিয়ে লুকোচুরির খেলায় মেতেছেন। এখানে
'ছিনিমিনি খেলা' প্রেমের লীলা, আকর্ষণ, অভিমান ও আত্মসমর্পণের প্রতীক।
সার্বিকভাবে, গানটি শ্রীকৃষ্ণের বাঁশিকে কৃষ্ণেরই প্রেমময় আহ্বানের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এই সুর মানুষকে সংসারের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে
কৃষ্ণপ্রেমের দিকে আহ্বান জানায়। গোপিনীর কণ্ঠে ব্যক্ত 'আমি চিনি' উচ্চারণটি আসলে সেই আত্মার ঘোষণা, যে তার চিরন্তন প্রিয়তম পরমাত্মার আহ্বানকে নিঃসন্দেহে চিনতে পারে। এখানে প্রেম, প্রকৃতি, ভক্তি ও কৃষ্ণলীলার অপূর্ব সমন্বয়ে মানবাত্মার ঈশ্বরমুখী আকাঙ্ক্ষাই প্রধান হয়ে উঠেছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ
(ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৭)
মাসে, সেনোলা রেকর্ড কোম্পানি থেকে
গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ৯ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২২৬৪। পৃষ্ঠা: ৬৭৮-৬৭৯।
- নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি
ঊনপঞ্চাশতম খণ্ড। স্বরলিপিকার: ইদ্রিস আলী। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট, কার্তিক
১৪২৬। নভেম্বর ২০১৯। পৃষ্ঠা: ৭৬-৮১ [নমুনা]
- রেকর্ড: সেনোলা [মার্চ ১৯৪১ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৭)। কিউ এস ৫১৫। শিল্পী:
মন্টুরাণী। সুর: নজরুল ইসলাম]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
-
ইদ্রিস আলী। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের
মার্চ মাসে সেনোলা রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত গানের [শিল্পী:
মণ্টুরানী] স্বরলিপি অনুসারে, স্বরলিপিটি নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি
ঊনপঞ্চাশতম খণ্ডে
অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ।
বন্দনা
- সুরাঙ্গ:
ঝুমুরাঙ্গ
- তাল: ঝুমুর