বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: ভারত-লক্ষ্মী আয় মা ফিরে দুঃখ-রাতের তিমির হরি'।
ভারত-লক্ষ্মী আয় মা ফিরে দুঃখ-রাতের তিমির হরি’।
হাতে ল’য়ে সোনার ঝাঁপি সুধার পাত্রে সুধা ভরি’॥
আঁচলে তোর উঠুক দুলে, নবীন ধানের মঞ্জরি সে
অঙ্গনতল মাতিয়ে দে মা, দোয়েল শ্যামার মধুর শিসে,
ফিরিয়ে দে সেই হারিয়ে যাওয়া রত্ন বোঝোই সোনার তরী॥
লক্ষ্মী মায়ের সন্তান আজ, হায় রে কেন লক্ষ্মী-ছাড়া?
দু মুঠো ভাত নেইকো পেটে, তৃষ্ণায় নেই তৃষ্ণা-ধারা।
কোন্ পাপে আজ সোনার এ দেশ, শ্মশান হল দে মা ব’লে
দুঃখ-সাগর মন্থর শেষ, ভরল ভুবন হলাহলে,
অমৃত এনে সন্তানে, বাঁচা মা তোর পায়ে ধরি॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে কবি ভারতভূমিকে দৈব-আসনে অভিষিক্ত করে ভারত-লক্ষ্মী নামে সম্বোধন করেছেন।
পরাধীন শ্রীহীনা ভারতে শ্রীসমৃদ্ধ, শান্তি ও কল্যাণের জন্য এই দেবীর কাছে করুণ আবেদন
উপস্থাপন করা হয়েছে। পরাধীন ভারত থেকে অন্তর্ধান হয়েছিলেন এই দেবীরূপিণী দেশমাতা।
তাই তাঁর কাছে প্রার্থনা— তিনি যেন আবার এই ফিরে এসে দুঃখ, দারিদ্র্য ও অন্ধকারে আচ্ছন্ন
ভারতের দীর্ঘ দুর্দিনের অবসান ঘটান। তাঁর হাতের সোনার ঝাঁপি ও অমৃতভরা পাত্র থেকে আশীর্বাদ বর্ষণ করে দেশকে পুনরায় সুখ, ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যে ভরিয়ে
দেন।
কবি চান, মায়ের আঁচলে আবার নতুন ধানের শীষ দুলুক, অর্থাৎ দেশের কৃষিক্ষেত্রে সমৃদ্ধি ফিরে আসুক। দোয়েল ও শ্যামা পাখির মধুর কূজন আবার জনপদকে মুখরিত করুক, চারদিকে প্রাণ, আনন্দ ও শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হোক। যে সোনার তরী একদিন দেশের অমূল্য সম্পদ, ঐতিহ্য ও গৌরব বহন করত, সেই হারিয়ে যাওয়া ঐশ্বর্যও যেন পুনরায় ফিরে আসে।
পরবর্তী স্তবকে কবি গভীর বেদনায় প্রশ্ন করেন—যে জাতি লক্ষ্মীদেবীর সন্তান, সেই জাতি আজ কেন লক্ষ্মীহীন? মানুষের পেটে দু'মুঠো অন্ন নেই, তৃষ্ণা নিবারণের জলও নেই। একসময়ের "সোনার দেশ" আজ কেন দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও শোকের কারণে শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেছে? তিনি যেন মায়ের কাছে জানতে চান, কোন পাপের ফলে এমন দুর্দশা নেমে এসেছে।
গানের শেষে কবি সমুদ্রমন্থনের পৌরাণিক উপমা ব্যবহার করেছেন। কবি মনে করেন, দুঃখের সমুদ্র মন্থন করে চারদিকে যেন হলাহল বিষ ছড়িয়ে পড়েছে; মানুষের জীবন বিষাদে পরিপূর্ণ। তাই তিনি মায়ের চরণে আশ্রয় নিয়ে আকুল প্রার্থনা করেন—'হে জননী, যেমন সমুদ্রমন্থনের শেষে অমৃত লাভ হয়েছিল, তেমনি তুমিও তোমার সন্তানদের জন্য অমৃতসম শান্তি, সুখ, অন্ন, আশা ও নবজীবন নিয়ে এসো এবং এই বিপর্যস্ত জাতিকে রক্ষা করো।'
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২)। ৩২৪২ সংখ্যক গান।
- রেকর্ড:
এইচএমভি [আগষ্ট
১৯৪৯ (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৫৬)। এন ৩১০৬৬। শিল্পী: সত্য চৌধুরী। সুর নজরুল ইসলাম]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: স্বদেশ। দৈবসত্তা। দেশমাতৃকা। ভারলক্ষ্মী