বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: দাসী হতে চাই না আমি হে শ্যাম কিশোর বল্লভ
দাসী হতে চাই না আমি হে শ্যাম কিশোর বল্লভ,
আমি তোমার প্রিয়া হওয়ার দুঃখ লব।
জানি জানি হে উদাসীন
দুঃখ পাব অন্ত বিহীন
বঁধুর আঘাত মধুর যে নাথ সে গরবে সকল সব॥
তোমার যারা সেবিকা নাথ, আমি নাহি তাদের দলে,
সর্বনাশের আশায় আমি ভেসেছি প্রেম-পাথার জলে।
দয়া যে চায় যাচুক চরণ
আমার আশা করব বরণ
বিরহে হোক মধুর মরণ, আজীবন সুদূরে রব॥
- ভাবার্থ: এই গানটিতে এক শ্রীকৃষ্ণানুরাগিণীর গভীর প্রেম, বিরহবেদনার
মাধুর্য এবং আত্মবিসর্জনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর কাছে কৃষ্ণপ্রেমই
জীবনের পরম প্রাপ্তি; আর সেই প্রেমের পথে যত দুঃখ, বেদনা ও বিরহই আসুক না কেন,
তা তাঁর কাছে আনন্দ ও গৌরবের বিষয়। তাই এই গানটি মূলত মধুর-রসের প্রেমভক্তির
এক অপূর্ব নিদর্শন।
গানের সূচনায় অনুরাগিণী শ্যাম কিশোর কৃষ্ণকে তাঁর প্রেমবল্লভ রূপে সম্বোধন
করেছেন। তিনি কৃষ্ণের দাসী হয়ে থাকতে চান না; বরং তাঁর প্রিয়া হওয়ার কঠিন ও
বেদনাময় পথ বেছে নিতে চান। এখানে 'দাসী' সাধারণ ভক্তির প্রতীক, আর 'প্রিয়া'
মধুরভাবের ভক্তির প্রতীক। বৈষ্ণব সাধনায় এই মধুরভাবকে ভক্তির সর্বোচ্চ স্তর বলে
মনে করা হয়, যেখানে ভক্ত ও কৃষ্ণের সম্পর্ক প্রেমিক-প্রেমিকার রূপ লাভ করে।
অনুরাগিণী জানেন, এই প্রেমে বিরহ ও বেদনা অবশ্যম্ভাবী; তবুও তিনি সেই দুঃখকে
স্বেচ্ছায় বরণ করতে প্রস্তুত।
গানের পরবর্তী অংশে তিনি উপলব্ধি করেন যে, শ্রীকৃষ্ণ চির অধরা ও উদাসীন। তাঁর
প্রেমে নিমগ্ন হলে অন্তহীন বিরহ ও অপেক্ষার দুঃখ সহ্য করতে হয়। কিন্তু সেই
দুঃখ তাঁর কাছে তিক্ত নয়, বরং মধুর। কারণ প্রিয়তমের দেওয়া আঘাতও তাঁর কাছে
প্রেমেরই নিদর্শন। তাই তিনি সেই বেদনাকে গৌরবের সঙ্গে গ্রহণ করেন। এখানে
প্রেমের এমন এক উচ্চতর স্তর প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে কষ্টভোগও আনন্দের উৎস হয়ে
ওঠে।
গানের মধ্যভাগে অনুরাগিণী নিজেকে কৃষ্ণের অন্যান্য সেবিকাদের থেকে পৃথক করে
দেখিয়েছেন। তিনি কেবল সেবার মাধ্যমে করুণা লাভ করতে চান না; বরং প্রেমের গভীর
সমুদ্রে আত্মবিসর্জন দিতে চান। ‘সর্বনাশের আশায়’ কথাটির মাধ্যমে তিনি নিজের
স্বতন্ত্র সত্তা, অহংকার ও জাগতিক পরিচয় বিলুপ্ত করার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন।
প্রেম-পাথারে ভেসে যাওয়া এখানে আত্মবিলোপ এবং পরম প্রেমে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত
হওয়ার প্রতীক।
গানের শেষাংশে তাঁর প্রেমসাধনার চরম রূপ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি কৃষ্ণের কাছে
করুণা বা দয়া প্রার্থনা করেন না; বরং বিরহকেই নিজের নিয়তি হিসেবে গ্রহণ করতে
চান। তাঁর বিশ্বাস, প্রিয়তমের থেকে দূরে থাকলেও সেই বিরহই তাঁর প্রেমকে আরও
গভীর ও বিশুদ্ধ করে তুলবে। তাই তিনি কামনা করেন, যদি মিলন না-ও ঘটে, তবে বিরহের
মধ্যেই যেন তাঁর জীবন অতিবাহিত হয় এবং সেই বিরহেই যেন তাঁর মধুর মৃত্যু ঘটে।
এখানে ‘মধুর মরণ’ বলতে শারীরিক মৃত্যুকে নয়; বরং প্রেমে সম্পূর্ণ
আত্মবিসর্জনের আনন্দময় পরিণতিকে বোঝানো হয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের জুন (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৩) মাসে, টুইন
রেকর্ড কোম্পানি গানটি প্রথম রেকর্ড করে।
এই সময়
নজরুল ইসলামের
বয়স ছিল
৩৭ বৎসর
১ মাস।
-
গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
৪৪৪]
-
রেকর্ড: টুইন [জুন ১৯৩৬
(জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৩)।
এফটি ৪৩৯৯। শিল্পী: রেণু দাস। সুর: নজরুল ইসলাম]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, পঞ্চদশ খণ্ড। ভাদ্র ১৪০৩। আগষ্ট
১৯৯৬। ১৯ সংখ্যাক গান। রেকর্ডে রেণু দাস-এর গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে।
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ।
প্রণয়। অজ্ঞাতা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গান
- তাল:
কাহারবা
- গ্রহস্বর: পা