বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: মোহাম্মদ নাম যত জপি, তত মধুর লাগে
মোহাম্মদ নাম যত জপি, তত মধুর লাগে।
নামে এত মধু থাকে, কে জানিত আগে॥
ঐ নামেরি
মধু চাহি'
মন-ভ্রমরা বেড়ায় গাহি',
আমার ক্ষুধা তৃষ্ণা নাহি ঐ নামের অনুরাগে॥
ও নাম প্রাণের প্রিয়তম,
ও নাম জপি মজনু সম,
ঐ নামে পাপিয়া গাহে প্রাণের কুসুম-বাগে॥
ঐ নামে মুসাফির রাহী,
চাই না তখ্ত্ শাহানশাহী,
নিত্য ও নাম ইয়া ইলাহী, যেন হৃদে জাগে॥
-
ভাবসন্ধান: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নামের প্রতি গভীর প্রেম, শ্রদ্ধা ও আত্মনিবেদন। কবি দেখিয়েছেন, নবীর স্মরণ মানুষের হৃদয়কে আধ্যাত্মিক আনন্দ, প্রশান্তি ও পরিতৃপ্তিতে ভরিয়ে তোলে।
এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে- কবি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নামের প্রতি গভীর প্রেম, ভক্তি ও আধ্যাত্মিক অনুরাগ
উপস্থাপন করেছেন। তাঁর অনুভূতিতে মহানবীর নাম এমন এক অমৃত, যা মানুষের হৃদয়কে শান্তি, আনন্দ ও আত্মিক পরিতৃপ্তিতে পূর্ণ করে।
সমগ্র গানটি সুফি-ভাবধারার প্রেমময় ভক্তিরসে সমৃদ্ধ।
গানের শুরুতেই কবি বলেন, তিনি যতই মহানবীর নাম জপ করেন, ততই সেই নাম তাঁর কাছে মধুর হয়ে ওঠে। এই মাধুর্য কোনো জাগতিক স্বাদের নয়; এটি আত্মার আনন্দ ও ঈমানের প্রশান্তির প্রতীক। তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, এই নামের মধ্যে যে এত অমৃতসুধা নিহিত আছে, তা তিনি আগে জানতেন না। অর্থাৎ নবীপ্রেমে নিমগ্ন হওয়ার পরই তিনি এর প্রকৃত মাহাত্ম্য উপলব্ধি করেছেন।
এরপর কবি তাঁর মনকে ভ্রমর বা মৌমাছির সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন ভ্রমর মধুর সন্ধানে ফুলে ফুলে বিচরণ করে, তেমনি তাঁর মনও মহানবীর নামের মধুরস লাভের জন্য সর্বদা ব্যাকুল। এই প্রেমে তিনি এমনভাবে তৃপ্ত যে, তাঁর আর কোনো পার্থিব ক্ষুধা বা তৃষ্ণা অবশিষ্ট থাকে না। এখানে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা বলতে ধন, যশ, ভোগ বা অন্যান্য জাগতিক আকাঙ্ক্ষাকে বোঝানো হয়েছে।
গানের পরবর্তী অংশে কবি বলেন, মহানবীর নামই তাঁর প্রাণের সবচেয়ে প্রিয়। তিনি সেই নাম এমন একাগ্রতার সঙ্গে জপ করেন, যেমন কিংবদন্তির প্রেমিক মজনু তাঁর প্রিয় লায়লীর প্রেমে সম্পূর্ণ আত্মহারা ছিলেন। এই উপমার মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, তাঁর নবীপ্রেম সর্বগ্রাসী, নিঃস্বার্থ এবং সর্বান্তকরণে নিবেদিত। আবার তিনি বলেন, তাঁর হৃদয়ের ফুলবাগানে পাপিয়া পাখি যেন সেই নামই গেয়ে চলে। এটি অন্তরের চিরন্তন আনন্দ, প্রেম ও স্মরণের প্রতীক।
গানের শেষাংশে কবি নিজেকে জীবনের এক মুসাফির বা পথিক হিসেবে কল্পনা করেন। তিনি বলেন, তাঁর কোনো রাজসিংহাসন বা পার্থিব ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা নেই। তিনি শুধু আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনাই করেন যে, মহানবীর নাম যেন সর্বদা তাঁর হৃদয়ে জাগ্রত থাকে। অর্থাৎ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ, শক্তি ও শান্তির উৎস হলো মহানবীর স্মরণ।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির
রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল (চৈত্র ১৩৪২-বৈশাখ ১৩৪৪) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৩৬ বৎসর ১০ মাস।
- গ্রন্থ:
- বনগীতিকা
- দ্বিতীয় সংস্করণ [১৩৫৯ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ (২৫ মে, ১৯৫২)]
- নজরুল রচনাবলী সপ্তম খণ্ড [কার্তিক ১৪১৯, নভেম্বর ২০১২। বনগীতি দ্বিতীয় খণ্ড। ৬। পৃষ্ঠা ১১৬]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২)। ৫৬৮ সংখ্যক গান। তাল: কাহারবা। পৃষ্ঠা: ১৭৩]
- রেকর্ড: এইচএমভি [এপ্রিল ১৯৩৬ (চৈত্র ১৩৪২-বৈশাখ ১৩৪৪)]। এন ৯৭১১। শিল্পী: মোহাম্মদ কাশেম
-
স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
সুধীন দাশ [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি,
চৌত্রিশতম খণ্ড, (একুশে
বই মেলা। ফাল্গুন ১৪১৮/ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ১৯তম গান
[নমুনা]
-
পর্যায়:ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল
- সুরাঙ্গ:
স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গান