বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মসজিদেরি পাশে আমার কবর দিও ভাই
মসজিদেরি পাশে আমার কবর দিও ভাই
যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান
শুন্তে পাই॥
আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাজীরা
যাবে,
পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি এ বান্দা শুনতে
পাবে।
গোর আজাব থেকে এ গুনাহ্গার পাইবে
রেহাই॥
কত পরহেজগার খোদার ভক্ত নবীজীর উম্মত,
ঐ মস্জিদে করে রে ভাই কোরান তেলাওয়াৎ।
সেই কোরান শুনে যেন আমি পরান জুড়াই॥
কত দরবেশ ফকির রে ভাই মস্জিদের আঙিনাতে
আল্লার নাম জিকির করে লুকিয়ে গভীর
রাতে।
আমি তাঁদের সাথে কেঁদে কেঁদে নাম জপ্তে চাই
আল্লার নাম জপ্তে চাই॥
- ভাবসন্ধান: মৃত্যুর পরও আল্লাহর স্মরণ, কোরআনের বাণী, আজানের ধ্বনি এবং নেককার মানুষের সান্নিধ্যে থাকার আকাঙ্ক্ষা। কবি নিজের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, ইবাদতপূর্ণ পরিবেশ, কোরআনের তিলাওয়াত এবং আল্লাহর জিকির মানুষের আত্মাকে প্রশান্তি দেয় এবং পরকালের মুক্তির পথ সুগম করে।
এই গানে কবি ঈমান, বিনয়, আত্মসমালোচনা এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। মৃত্যুর পরও যেন আল্লাহর স্মরণ, ইবাদতের পরিবেশ এবং নেককার মানুষের সংস্পর্শ থেকে তিনি বঞ্চিত না হন-এই আন্তরিক প্রার্থনাই গানটির মূল সুর।
গানের শুরুতে কবি বলেন, তাঁর কবর যেন মসজিদের পাশে দেওয়া হয়। এর অর্থ এই নয় যে কেবল স্থানগতভাবে মসজিদের কাছে সমাধিস্থ হওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য; বরং তিনি বোঝাতে চান, মৃত্যুর পরও যেন তাঁর আত্মা আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদতের পবিত্র আবহের সঙ্গে যুক্ত থাকে। মোয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনি তাঁর কাছে আল্লাহর আহ্বানের প্রতীক, যা জীবন ও মৃত্যুর সীমা অতিক্রম করে ঈমানের চেতনা জাগ্রত রাখে।
এরপর কবি কল্পনা করেন, নামাজিরা যখন তাঁর কবরের পাশ দিয়ে মসজিদে যাবে, তাঁদের পবিত্র পদধ্বনি যেন তাঁর কানে পৌঁছায়। এখানে পায়ের শব্দ কেবল শারীরিক শব্দ নয়; এটি নেক আমল, ঈমান এবং আল্লাহমুখী জীবনের প্রতীক। কবি বিশ্বাস করেন, নেককার মানুষের এই পরিবেশ ও আল্লাহর রহমত তাঁর গুনাহ মাফের কারণ হতে পারে। তাই তিনি বলেন, এর মাধ্যমে তিনি কবরের আজাব থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা করেন।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি মসজিদে কোরআন তিলাওয়াতের প্রসঙ্গ আনেন। পরহেজগার, আল্লাহভীরু মানুষ যখন কোরআন তিলাওয়াত করেন, তখন সেই পবিত্র বাণী তাঁর আত্মাকেও শান্তি দেবে—এমন আশা তিনি ব্যক্ত করেছেন। এখানে কোরআনের তিলাওয়াতকে আত্মার প্রশান্তি ও আল্লাহর রহমতের উৎস হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
সবশেষে কবি দরবেশ ও ফকিরদের রাত্রিকালীন জিকিরের দৃশ্য তুলে ধরেন। তাঁরা নির্জনে আল্লাহর নাম স্মরণ করেন, কান্নার মাধ্যমে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। কবির আকাঙ্ক্ষা, তিনিও যেন তাঁদের সঙ্গে আল্লাহর নাম জপ করতে পারেন। এটি মূলত আল্লাহর প্রতি চূড়ান্ত আত্মনিবেদন, তাওবা এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির আকুল বাসনার প্রকাশ।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪৭) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি
এই গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স
ছিল ৪১ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ৫৮৪ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা:
১৭৮।
- রেকর্ড
- এইচএমভি [জুলাই ১৯৪০ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪৭)। এন ১৭৪৭৬। শিল্পী: মহম্মদ কাশেম। সুর:
নজরুল ইসলাম]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। প্রার্থনা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের সুর