বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মদিনার শাহানশাহ্ কোহ্-ই-তূর-বিহারী
মদিনার শাহানশাহ্ কোহ্-ই-তূর-বিহারী
মোহাম্মদ মোস্তফা নবুয়তধারী॥
আল্লার প্রিয় সখা, দুলাল মা আমেনার
খোদিজার স্বামী, প্রিয়তম আয়েশার
আস্হাবের হাম্দম্ ওয়ালেদ ফাতেমার,
বেলালের আজান, খালেদের তলোয়ার,
কেয়ামতে উম্মত শাফায়ত-কারী॥
তৌহিদ-বাণী মুখে, আল-কোরআন হাতে
খোদার নূর দেখি যাঁর হাসির ইশারাতে
যাঁর কদমের নীচে দুলে কত জিন্নাত,
যে দু’হাতে বিলালো দুনিয়ায় খোদার মোহাব্বত
হো মেরাজের দুলহা আল্লার আর্শচারী॥
নয়নে যাঁর সদা খোদার রহমত ঝরে
সংসার মরুবাসী পিয়াসার তরে
আনিল যে কওসর সাহারা নিঙাড়ি’॥
- ভাবসন্ধান: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অসামান্য মর্যাদা, তাঁর মহান চরিত্র, আল্লাহর প্রতি তাঁর নৈকট্য এবং মানবজাতির জন্য তাঁর আনা হেদায়েত, রহমত ও ভালোবাসার প্রশস্তি। কবি রূপক, উপমা ও ঐতিহাসিক ইঙ্গিতের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, মহানবী (সা.) কেবল একজন নবী নন; তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত, সত্যের পথপ্রদর্শক এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ।
এই গানে কবি গভীর ভক্তি, প্রেম ও শ্রদ্ধার সঙ্গে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মহিমা, তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং মানবজাতির প্রতি তাঁর অবদানের প্রশস্তি গেয়েছেন। প্রতিটি চরণে নবীর জীবন, চরিত্র ও ইসলামী ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো কাব্যিক রূপকে তুলে ধরা হয়েছে।
কবি গানের শুরুতেই মহানবী (সা.)-কে মদিনার শাহানশাহ বলে অভিহিত করেছেন। তবে এটি কোনো পার্থিব রাজত্বের অর্থে নয়; বরং তিনি মানুষের হৃদয়ের সম্রাট এবং ইসলামের মহান পথপ্রদর্শক। তাঁকে কোহ-ই-তূর-বিহারী বলা হয়েছে এই অর্থে যে, তিনি সেই ঐশী আলোর ধারক, যার মাধ্যমে আল্লাহর বাণী মানবজাতির কাছে পৌঁছেছে। তিনি আল্লাহর প্রিয় বান্দা, মা আমিনার স্নেহধন্য সন্তান, খাদিজা (রা.)-এর স্বামী, আয়িশা (রা.)-এর প্রিয়তম, কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর পিতা এবং সাহাবিদের আন্তরিক সঙ্গী। তাঁর জীবনকে ঘিরে ইসলামের ইতিহাসের মহান ব্যক্তিত্বদের স্মৃতিও এখানে একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। যেমন—বিলালের আজান ইসলামের আহ্বানের প্রতীক এবং খালিদের তলোয়ার ইসলামের রক্ষায় সাহস ও সংগ্রামের প্রতীক।
কবি আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, কিয়ামতের দিনে মহানবী (সা.) তাঁর উম্মতের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ (শাফাআত) করবেন—এটি ইসলামী বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এরপর কবি বলেন, মহানবীর মুখে ছিল তাওহিদের বাণী এবং তাঁর হাতে ছিল আল-কোরআনের দিশা। তাঁর হাসি, আচরণ ও চরিত্রে আল্লাহর নূরের প্রতিফলন দেখা যেত। তাঁর পদচিহ্ন বরকতময়; তাঁর জীবন ও কর্ম মানুষকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করে। তিনি সমগ্র পৃথিবীতে আল্লাহর ভালোবাসা, দয়া ও শান্তির বাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন। কবি তাঁকে মিরাজের বর (মেরাজের দুলহা) বলে অভিহিত করেছেন, কারণ তিনি সেই মহান ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে মিরাজের মহাসৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।
সবশেষে কবি বলেন, মহানবীর চোখে সর্বদা আল্লাহর রহমত ঝরে পড়ত। মানবসমাজ ছিল মরুভূমির তৃষ্ণার্ত পথিকের মতো—আত্মিক শান্তি ও সত্যের সন্ধানে ক্লান্ত। মহানবী (সা.) তাঁদের জন্য জান্নাতের কাওসার-এর সুধার মতো ঈমান, হেদায়েত ও মুক্তির অমৃতধারা এনে দিয়েছেন। ফলে শুষ্ক ও অন্ধকারাচ্ছন্ন মানবজীবন নবীর শিক্ষায় সঞ্জীবিত ও আলোকিত হয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৪)
মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির
প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ৬ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ৭৩৭ সংখ্যক গান।
- রেকর্ড:
এইচএমভি
[ডিসেম্বর ১৯৩৭ (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৪)]। এন ১৭০০৮। শিল্পী:
মহম্মদ কাশেম। সুর: কমল দাশগুপ্ত।
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: রশিদুন্ নবী।
নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি (বিংশ খণ্ড)। [কবি নজরুল
ইন্সটিটিউট] ১৭ সংখ্যক গান
[নমুনা]
- সুরকার: কমল দাশগুপ্ত
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল
- সুরাঙ্গ: ভজন
- তাল:
কাহারবা
- গ্রহস্বর: সা