বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: ভক্ত নরের কাছে হে নারায়ণ চিরদিন আজ হারি
ভক্ত নরের কাছে হে নারায়ণ চিরদিন আজ হারি
তাই তো তোমায় নামায়েছি ব্রজে গোলক হইতে কাড়ি॥
চতুর্ভুজের দ্বিভুজ হরিয়া বেঁধেছি যশোদা দুলাল করিয়া
বনমালা পীত বসন পরিয়া হয়েছ ময়ূর মুকুটধারী॥
রাঙা পায়ে তব নূপুর পরায়ে নাচায়েছি পথ মাঝে
হাতে দিয়ে বেণু সাথে দিয়ে ধেণু সাজানু গোপাল সাজে।
ভগবান বলে মোরা না ধেয়াই চোর কপট নিঠুর বলি তাই
সুমধুর গালি দিয়েছি কানাই বামে দিয়ে রাধা প্যারী॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে নারায়ণ তথা বিষ্ণুর কাছে এক অনন্য ভক্তিভাব
উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে ভক্ত তাঁর কাছে ভক্তের প্রেমের কাছে স্বয়ং নারায়ণও পরাজিত
হয়- এমন অনন্য দর্শন উপস্থিত করা হয়েছে। সর্বশক্তিমান নারয়ণ ভক্তের প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নিজের ঐশ্বর্য ত্যাগ করে মানুষের আপনজন হয়ে ওঠেন। গানের মূল উপজীব্য হল- ভক্তি
নারায়কে জয় করার মূলমন্ত্র।
গানের শুরুতেই ভক্ত বলেন- 'ভক্ত নরের কাছে হে নারায়ণ চিরদিন আজ হারি।' অর্থাৎ ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হলেও ভক্তের নিঃস্বার্থ প্রেমের কাছে তিনি স্বেচ্ছায় পরাজয় স্বীকার করেন। সেই কারণেই বৈকুণ্ঠ বা গোলকধাম থেকে তাঁকে পৃথিবীর ব্রজধামে
তিনি নেমে এসেছেন অবতার রূপে। এখানে "কাড়ি" শব্দটি জোর করে নিয়ে আসার অর্থে নয়; বরং ভক্তির আকর্ষণে
নারায়ণের অবতীর্ণ হওয়ার কাব্যিক প্রকাশ।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, ভক্তরা চতুর্ভুজ নারায়ণের দুই হাত লুকিয়ে তাঁকে দ্বিভুজ কৃষ্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করেছেন। অর্থাৎ ঐশ্বর্যময় বিষ্ণুর পরিবর্তে তাঁকে যশোদার স্নেহের শিশু, গোপাল ও ব্রজের রাখালরূপে দেখা হয়েছে। তাঁর হাতে শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মের পরিবর্তে তুলে দেওয়া হয়েছে বাঁশি, গলায় পরানো হয়েছে বনমালা, মাথায় শোভা পেয়েছে ময়ূরপুচ্ছ। এই রূপান্তর দেখায় যে, ভক্তের কাছে ঈশ্বরের মহিমার চেয়ে তাঁর মাধুর্যই অধিক প্রিয়।
এরপর কবি বলেন, কৃষ্ণের রাঙা পায়ে নূপুর পরিয়ে তাঁকে পথে পথে নাচিয়েছেন, হাতে দিয়েছেন বাঁশি এবং সঙ্গে দিয়েছেন ধেনু, যাতে তিনি গোপাল সেজে ব্রজের মাঠে বিচরণ করেন। অর্থাৎ ভক্ত ঈশ্বরকে দূরের পূজ্য দেবতা হিসেবে নয়, বরং ঘরের ছেলে, বন্ধু ও আপনজন হিসেবে অনুভব করতে চান। বৈষ্ণব ভক্তিধারায় এটিই মাধুর্যভাব ও বাত্সল্যভাব-এর বিশেষ লক্ষণ।
গানের শেষাংশে কবি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহীভাবে বলেন, 'ভগবান' বলে দূর থেকে তাঁকে ধ্যান করি না; বরং
'চোর', 'কপট', 'নিষ্ঠুর' বলে মধুর অভিমান করি। এই কথাগুলো অসম্মানসূচক নয়; বরং প্রেমের ভাষা। গোপীরা যেমন কৃষ্ণকে
'ননীচোরা' বা 'চিত্তচোর' বলে স্নেহভরে ডাকতেন, তেমনি ভক্তও ভালোবাসার অধিকারেই তাঁকে মধুর গালি দেন। শেষে কৃষ্ণের পাশে রাধাকে বসিয়ে তাঁর প্রেমলীলা পূর্ণতা দেওয়া হয়েছে। রাধা ছাড়া কৃষ্ণের মাধুর্য অসম্পূর্ণ-এই বৈষ্ণব ভাবনাও এখানে প্রতিফলিত হয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি (পৌষ-মাঘ ১৩৪৫) মাসে, এইচএমভি
রেকর্ড কোম্পানি থেকে এই গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময়
নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৭ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান
সংখ্যা ৮৫৮। পৃষ্ঠা: ২৬৪]
- রেকর্ড: এইচএমভি [জানুয়ারি ১৯৩৯ (পৌষ-মাঘ ১৩৪৫)। নম্বর: ১২৬৬৯। শিল্পী:
শোভারাণী দে। সুর: সুখময় গাঙ্গুলী]
- পর্যায়
- বিষাঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। নারায়ণ। ভক্তি