বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লে আলা
মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লে আলা
তুমি বাদ্শারও বাদ্শাহ্ কম্লিওয়ালা॥
পাপে-তাপে পূর্ণ আঁধার দুনিয়া
হ'ল পুণ্য বেহেশ্তী নূরে উজালা॥
গুনাহ্গার উম্মত লাগি' তব
আজো চয়ন্ নাহি, কাঁদিছ নিরালা॥
কিয়ামতে পিয়াসি উম্মত লাগি'
দাঁড়ায়ে রবে ল'য়ে তহুরার পিয়ালা॥
জ্বলিবে রোজ হাশরে দ্বাদশ রবি
কাঁদিবে নফ্সি ব'লে সকল নবী
য়্যা উম্মতী য়্যা উম্মতী, একেলা তুমি
কাঁদিবে খোদার পাক আরশ চুমি'
পাপী উম্মত ত্রাণ তব জপমালা॥
করে আউলিয়া আম্বিয়া তোমারি ধ্যান
তব গুণ গাহিল খোদ্ আল্লাহতা'লা॥
- ভাবসন্ধন: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মানবজাতির জন্য রহমত, করুণা ও মুক্তির পথপ্রদর্শক। তিনি পৃথিবীকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে সত্যের আলোয় এনেছেন এবং ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী কিয়ামতের দিনও তাঁর উম্মতের কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে শাফাআত করবেন। এই ভাবনা অনুসরণে এই গানে কবি গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মহিমা, তাঁর করুণা এবং উম্মতের প্রতি তাঁর সীমাহীন ভালোবাসার প্রশস্তি গেয়েছেন। ইসলামী বিশ্বাসের বিভিন্ন ধারণা- নবুয়ত, রহমত, শাফাআত এবং কিয়ামতের দিনের ঘটনাবলি এই গানে
উপস্থাপিত হয়েছে।
গানের শুরুতেই কবি মহানবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম নিবেদন করে তাঁকে 'বাদশারও বাদশাহ' এবং
'কমলিওয়ালা' বলে সম্বোধন করেছেন। এখানে বাদশারও বাদশাহ বলতে পার্থিব সাম্রাজ্যের শাসকের
তিনি বাদশাহ। অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ বাদশা। কমলিওয়ালা শব্দটি তাঁর সরল, সংযমী ও বিনয়ী জীবনযাপনের প্রতীক।
এরপর কবি বলেন, মহানবীর আবির্ভাবের আগে পৃথিবী পাপ, অজ্ঞতা ও নৈতিক অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহর হেদায়েত ও নূরের আলো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানবসমাজ সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে পরিচালিত হয়। তাই কবি রূপকভাবে বলেছেন, অন্ধকার পৃথিবী জান্নাতের আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
গানটির পরবর্তী স্তবকে কবি মহানবীর অসীম মানবপ্রেমের কথা স্মরণ করেন। তিনি মনে করেন, মহানবী (সা.) আজও তাঁর গুনাহগার উম্মতের জন্য ব্যাকুল। এখানে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী মহানবী তাঁর অনুসারীদের কল্যাণ ও মুক্তির জন্য সর্বদা দয়াশীল এবং কিয়ামতের দিনও তাঁদের জন্য সুপারিশ (শাফাআত) করবেন।
এরপর কিয়ামতের দিনের এক মর্মস্পর্শী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কবি বলেন, সেদিন ভয়াবহ উত্তাপ ও আতঙ্কে সবাই নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। অন্যান্য নবীরা নিজেদের মুক্তির জন্য চিন্তিত থাকবেন, কিন্তু মহানবী (সা.) বারবার
'ইয়া উম্মতী, ইয়া উম্মতী' (হে আমার উম্মত) বলে তাঁর অনুসারীদের জন্য আল্লাহর কাছে করুণা প্রার্থনা করবেন। তহুরার পেয়ালা এখানে জান্নাতের পবিত্র পানীয় ও আল্লাহর রহমতের প্রতীক। কবির ভাষায়, মহানবী তাঁর উম্মতের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য সেই রহমতের পেয়ালা হাতে দাঁড়িয়ে থাকবেন।
সবশেষে কবি বলেন, অলী-আউলিয়া ও নবী-রাসুলগণও মহানবীর মহিমা স্মরণ করেন। এমনকি আল্লাহ নিজেই তাঁর প্রিয় রাসুলের মর্যাদা উচ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে কবি মহানবীর অনন্য সম্মান ও বিশ্বজনীন মর্যাদার প্রতি তাঁর গভীর বিশ্বাস প্রকাশ করেছেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। এইচএমভি কোম্পানি থেকে ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের জুন (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪০) মাসে গানটির রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ:
-
গুলবাগিচা
- প্রথম সংস্করণ [১৩ আষাঢ় ১৩৪০, ২৭ জুন ১৯৩৩। ভীমপলশ্রী-কার্ফা। পৃষ্ঠা:
১০৭]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা।
জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গুল-বাগিচা। গান সংখ্যা ৮৬। ভীম
পলশ্রী-কার্ফা। পৃষ্ঠা ২৭৯]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
৯৫১। তাল: কাহার্বা। পৃষ্ঠা:
২৯১-২৯২।]
- রেকর্ড:
এইচএমভি
[জুন ১৯৩৩ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪০)]
এন ৭১১৮। শিল্পী: মহ. কাশেম
-
স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
সুধীন দাশ [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি,
চৌত্রিশতম খণ্ড, (একুশে
বই মেলা। ফাল্গুন ১৪১৮/ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ২০তম গান [নমুনা]
-
পর্যায়:: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল
- সুরাঙ্গ:
স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গান