শেখ ভানুর ধর্মসঙ্গীত মূলতঃ হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মের মিশ্র ভাবাশ্রিত। কোনো গানে আল্লাহ, রাসুল, পাক-পাঞ্জাতন, ওলি-আউলিয়ার গুণগান করা হয়েছে।
কোনো গানে রাধা-কৃষ্ণের গুণকীর্তন করা হয়েছে। কিছু গানে আবার উভয় ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রসমূহকে একসাথে স্থান দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ধর্মীয় তীর্থস্থান ভ্রমণের বাসনাও প্রকাশিত হয়েছে ধর্মসঙ্গীত পর্যায়ের গানে।
সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মিলনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গোনেন শেখ ভানু। তিনি মনে করেন, সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে বিচ্ছেদই তাঁর যাবতীয় দুঃখের কারণ।
তিনি অনেক সাধনা করে জ্ঞানচক্ষু লাভ করার চেষ্টা করেন, প্রতিটি কাজ বিসমিল্লাহ বলে শুরু করেন, যাতে স্রষ্টার দর্শন পাওয়া যায়।
কিন্তু স্রষ্টা তাঁকে সহজে ধরা দেননা, তিনি সরলমনে স্রষ্টার দেখা পেতে চান, নামাজ-রোজা করেন, শরীয়তের বিধি অনুসরণ করেন।
কিন্তু স্রষ্টা তাঁকে দুঃখের আগুনে পুড়িয়ে ধৈর্য্য পরীক্ষা করেন।
ষড়রিপুর তাড়না দিয়ে তাকে বিচলিত করে রাখেন। সর্পদংশন যেমন যন্ত্রণাদায়ক, স্রষ্টার বিচ্ছেদে তেমনি যন্ত্রণা ভোগ করেন তিনি।
দুঃখে ও হতাশায় শেখ ভানু সারারাত ধরে অশ্রুজলে ভাসেন।
হাশরের দিনে যখন পাপ-পুণ্য পরিমাপ করা হবে, সেই দিনকে ভয় করেন তিনি। ভয়ে চোখের জল ফেলেন।
জ্ঞানের সাহায্যে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করার পন্থা তিনি জানেন না, তাই নিতান্ত ভক্তিমিশ্রিত অশ্রুকে সম্বল করেই তিনি স্রষ্টার সন্ধান করে ফেরেন।
এছাড়া তিনি বিশ্বাস করেন, শিশু কাঁদলে যেমন মা কোলে তুলে নেয়, দুধ খাওয়ায়,
তেমনি সৃষ্টিকর্তার নাম স্মরণ করে বান্দা কাঁদলেও সৃষ্টিকর্তা বান্দার প্রতি অনুগ্রহ করেন, ইহকালে অনেক কষ্ট দিলেও পরকালে তাকে দয়া করেন।।
ইব্রাহিম নবীকে আগুনে পোড়ানো সত্বেও যেমন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, ইউসূফ নবীক কূপে নিক্ষেপ করা সত্ত্বেও যেমন মিশরের বাদশাহী দেওয়া হয়েছিলো, তেমনি শেখ ভানু বিশ্বাস করেন,
তাকে অনেক দুঃখ দিলেও, শেষে পুরস্কৃত করা হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, সৃষ্টিকর্তা যা করেন, ভালোর জন্যই করেন। তাছাড়া শেষ নবীর অনুসারী হিসেবে নিজের শ্রেষ্ঠত্বেও
বিশ্বাস করেন শেখ ভানু। তাই স্রষ্টার কাছে নিজেকে শেষ নবীর অনুসারী পরিচয় দিয়ে বাড়তি সুবিধা আদায় করতে চান।
অদর্শনের যন্ত্রণায় কাতর হয়ে ভাবেন, এমন যন্ত্রণাদায়ক জীবনের চেয়ে মৃত্যুও বরং ভালো। তাই গলায় কলসি বেঁধে জলে ডুবে আত্মহননের চিন্তাও করেন মাঝেমধ্যে।
লোকের মুখে তিনি বারবার শোনেন, "বিশ্বাসীর হৃদয়ের সৃষ্টিকর্তার আসন" কিন্তু হাদীস পড়ে দেখেন না বলে তিনি এর মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারেন না।
তিনি বিশ্বাস করেন, সৃষ্টিকর্তাকে যে যেভাবেই ডাকুক, সেই ডাকেই তিনি সাড়া দেন। এ ভরসায় তিনি অসংখ্যবার বিভিন্ন নামে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকেন, তাঁর দর্শন ভিক্ষা করেন।
কখনো আল্লাহ নামে ডাকেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' জিকিরকে সম্বল করে, কখনো শ্যাম নামে ডাকেন। অজ্ঞানতার অকুল সাগরে তিনি সাঁতার কাটেন। দিনের পর দিন বয়ে যায়, জাতি কুল ছেড়ে উদাসীর বেশে ভ্রমণ করেন শেখ ভানু, কিন্তু তিনি অতি নির্বোধ হওয়ায় এবং অনেক দেরীতে অনুসন্ধান শুরু করায়, তাঁর কর্মদোষে সৃষ্টিকর্তা সাড়া দেননা।
সারা জগৎ স্রষ্টাময় হওয়া সত্ত্বেও শেখ ভানু তাঁর দেখা পাননা। তাঁর আশা অপূর্ণই থেকে যায়। ইহকাল এবং পরকাল, দু-কুলেই বঞ্চিত হন তিনি। অন্তর যেন শূলবিদ্ধ হয়।
এ যেন ফলের বাগানে প্রবেশ করেও ফল ভক্ষণ করতে না পারা বুলবুল পাখির আর্তনাদ।
তবে, কোনো একদিন যথোপযুক্ত সময়ে সৃষ্টিকর্তা নিজেই শেখ ভানুকে দর্শন দিয়ে তাঁর অন্তরলোক আলোকিত করবেন, সেই আশায় দিন গোনেন তিনি।
এবং অন্যদেরকেও রিপুর বশবর্তী না হয়ে, সময় থাকতে পীর-মুর্শিদ বা গুরুর কাছে দীক্ষা নিতে পরামর্শ দেন।