শেখ ভানুর গুরুতত্ত্ব ও পীর মুর্শিদী পর্যায়ের গানসমূহের সারমর্ম

শেখ ভানু এই জগতের বাহ্যিক রূপ দেখে সম্মোহিত হয়ে আছেন। বাহ্যিক রূপের প্রকটতা তাঁকে জগতের অভ্যান্তরীন রূপ দেখতে দেয়না, অন্ধ করে রাখে। ফলে তিনি জীবনের সমস্যাসমূহের কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাননা। তাঁর দেহতরীটি খুব একটা মজবুত নয়, তার উপরে আবার ষড়রিপুর অত্যাচার (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য) তাকে প্রতিনিয়ত বিরক্ত করে, ধ্যানভঙ্গ করে। তিনি মনের উপরে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনো কিছুর গভীরে প্রবেশ করতে পারেন না। তাঁর মনটা কামিনী নামক ফুলের মধুতে মাতাল হয়ে থাকে। নেশার ঝোকে নিজের বুকেই শেল মারতে উদ্যত শেখ ভানু। অপরদিকে আছে সংসারের নানাবিধ যাতনা, যা তাকে তাঁর ভাবনা থেকে বিচ্যূত করতে প্রচণ্ড রকম তৎপর। বৃথা কাজে শেখ ভানুর দিন বয়ে গেলো, তিনি জানতে পারলেন না কোথা থেকে এসেছেন, কোথায় যাবেন। অনেক মাওলানা-মৌলভি, অনেক এমএ-বিএ পাশ লোকও তা জানেনা। তাই তো পরের সম্পদ আত্মসাৎ করে। জীবনরূপী নদীতে কুমির রূপী কামনা বাসনা দ্বারা আসক্ত হয়ে গেলে দেহরূপী নৌকা ডুবে যাবে, অর্থাৎ দেহের ক্ষয় হবে, মৃত্যু ত্বরান্বিত হবে। পাপী অবস্থায় মৃত্যুর মুখোমুখি হলে মৃত্যু অনেক যন্ত্রণাদায়ক হবে। দম ফুরিয়ে গেলে কবরে যেতে হবে। সেখানে পুণ্যকর্ম সাথে নিয়ে না গেলে ভীষণ বিপদে পড়তে হবে। তাই সংসারের যাতনা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য প্রেমিক হয়ে, গুরু পীর বা মুর্শিদ এর চরণের অধীন হয়ে তাঁর নিকট থেকে দেহাভ্যান্তরস্থ ত্রিবেণীর দ্বার চিনে নিতে চান শেখ ভানু। যা চিনলে নবীর কালেমাকে সার করে আল্লাহ নিরঞ্জনকে ভজলে সাধক এমন গুণ লাভ করবেন, যার ফলে তিনি নিগুম ঘরে বিরাজ করে সকল প্রকার বিচ্যূতি থেকে মুক্ত থাকবেন এবং পুণ্য অর্জন করতে সক্ষম হবেন। অপরদিকে নবীকে স্মরণের ফলে নবীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে। ফলে বিচার দিবসে নবীর সুপারিশও মিলবে। সত্যের অনুসন্ধানী অনেক সাধক সহায়-সম্পদ-রাজত্বাদি ছেড়ে পরকালের পুঁজি সঞ্চয় করেছেন। শেখ ভানুও তাঁদের দলে ভিড়তে চান। শেখ ভানুর জীবন প্রায় শেষের দিকে চলে এসেছে, অথচ তিনি এখনও পীর-মুর্শীদের শরণাপন্ন হননি, ফলে স্রষ্টার দেখা পাননি। নানা দেশ ভ্রমণ করেও স্রষ্টার দেখা পাওয়া যায়নি। ভবসিন্ধু সাগরে তিনি হাবুডুবু খাচ্ছেন, মন তাঁর রিপুর বশীভূত। তাই তিনি প্রভুর নাম নিতে পারছেন না। কদম্বতলে (শ্রীকুলাতে) কে যেন নিপুণ কারিগরী সহযোগে বাঁশি বাজায়, তা দেখার ইচ্ছা সত্বেও কাল ননদী (রিপু) তাকে যেতে দেয়না। ভবের হাটে এসে তাঁর বেচাকেনা কিছুই হয়নি। কারণ তিনি ঘরে বসে মহাজনের দেওয়া মূলধন (হীরা লাল পরশমণি) ভেঙে খেয়েছেন, হাটের গণ্ডগোলে মজে, ষড়রিপুর ছলনায় ভুলে বুঝতেই পারেননি সেই মহামূল্যবান ধন রাঙ নাকি সোনা। সে পুঁজি বিতরণ করেছেন কামিনীর ধ্যানে। হাটে এসে মানুষের কথায় বিশ্বাস করে বোঝার ভুলে মহাজনের দেওয়া মূল্যবান রতনের বিনিময়ে মূল্যহীন ঘূণের গুড়া কিনেছেন। আলস্যের কারণে মহাজনের দেওয়া কড়ি জঙ্গলে ফেলে রেখে কুচিন্তায় মগ্ন হয়ে বেলা পার করেছেন। চুন ভেবে নষ্ট করেছেন সুস্বাদু দই। আপন না চিনে বিদেশীর সঙ্গে মহব্বত করেছেন। অন্তরে লেগেছে হীরার ধার। দুঃখে তাঁর হাড় চূর্ণ চূর্ণ হয়ে গেছে। এবার তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। মানুষের কথায় যে মনের মানুষ ধরা যায়না, এবার তাঁর কাছে কথাটা স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু এখন দুঃখভারাক্রান্ত মনে সন্ধ্যা বেলায় হাট ভাঙার সময়ে তিনি লক্ষ্য করে দেখছেন, তাঁর হিসাব খাতায় শুধুই বাকীর হিসাব লেখা, নগদ কিছুই নেই। মহাজন যেদিন হিসাব চাইবেন সেদিন ধূলায় পড়ে কাঁদবেন তিনি, যেভাবে জল ছাড়া মাছ ছটফট করে, তেমন দশা হবে লক্ষ দোষের দোষী ভানু বেপারীর। অপরদিকে সুজন বেপারী চাতুরী করে বেলা থাকতেই মহাজনের সদর অফিসে গিয়ে নামজারী করে এসেছে। হাটের বেচাকেনায় অনেক পিছিয়ে গেছেন ভানু বেপারী। ভাঙা তরী নিয়ে ভবনদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে ভাবছেন, কেমন করে পার হবেন। মনুষ্য জনম আর হবেনা। এমতাবস্থায় একমাত্র মুর্শীদই তাঁকে রক্ষা করতে পারেন। তাই শেখ ভানু এক মুহুর্তের জন্যও মুর্শীদকে ভুলতে চাননা। স্ত্রী-পুত্র, মাতা-পিতা, ভগ্নি-ভ্রাতা কেউ কারো আপন নয়। একমাত্র মুর্শিদই আপন। তাই চাতকিনী পাখির মতো মুর্শীদের আশায় করজোরে প্রার্থণা করে করে রাত কাটে তাঁর। কিন্তু তিনি মুর্শীদের দেখা পাননা। কিসে পাবেন তাও জানেন না। দুনিয়াটা স্থির থাকবেনা। ভাবে বোঝা যায় শেখ ভানু শীঘ্রই মারা যাবেন, কিন্তু তবু নির্দয় শাহ মিরান তাঁকে দেখা দেননা। কারণ শেখ ভানুর মনটা কঠিন, ভাবে রত হয়না। তাই দিক-নির্দেশনার অভাবে মাওলার আশায় কাঁদতে কাঁদতেই তাঁর জীবনাবসান হবে বলে আফসোস করে শেখ ভানু তাঁর বন্ধুদের বলেন, তিনি যদি মুর্শীদের দেখা না পেয়েই মারা যান, তবে বন্ধুরা যেন মুর্শীদের নামটি তাঁর বুকের উপরে লিখে দেয়, যা দেখে দয়াপরবশ হয়ে হয়তো মুর্শীদ তাঁর গায়ে হাত রাখবেন। শেখ ভানু নিজ মনে চিন্তা করে দেখেন সৃষ্টিকর্তা সর্বত্র বিরাজ করেন। তাই সারাক্ষণ "ইল্লাল্লাহু" জিকিরে রত থাকতে চান। কারণ এই নামই ভবনদীর একমাত্র পাড়ের কড়ি। ত্রিভুবনের স্রষ্টা যখন একাকীত্বে ভুগছিলেন, কথা বলার কোনো বন্ধু ছিলনা, তখন এই "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু" ধ্বনি উচ্চারণ করেই রাসুলকে বন্ধু হিসেবে সৃষ্টি করেছিলেন আল্লাহ। এ কুদরতি নাম যে ভুলে যাবে তাকে কখনোই ভবনদী পার করা হবেনা। শেখ ভানু একা একা ত্রিপিনির বাঁকে গিয়ে দেখলেন শনি শোনে, রবি দেখে, সোম রাতদিন বাঁশি বাজায়, মঙ্গল কালাম পাঠ করে, বুধ অন্তরপুরে থাকে। কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন না এগুলো জাহির (প্রকাশ্য) নাকি বাতিন (গোপন)। তাই তিনি বৃহস্পতি ও শুক্রবার দুই চোখ বেঁধে মুর্শীদের নাম জপতে চান, যাতে মুর্শীদ তাঁর মনটা গলিয়ে মোমের মতো নরম করে দেন। তিনি শীঘ্রই মুর্শীদের কাছে গিয়ে কাঁদতে চান যাতে কান্না শুনে মুর্শীদ তাঁকে কোলে তুলে নেন। তাকে শিখিয়ে দেন আল্লাহ ও নবীর পরিচয়। দেখিয়ে দেন দেহের মধ্যকার সেই স্থান যেখানে এক অপরুপ সুন্দর প্রদীপ সারাক্ষণ জ্বলে আছে। পীর যাকে মহামন্ত্র দেবেন, সেই চিনবে দেহের অভ্যান্তরীন সকল যন্ত্র। এতে শেখ ভানু তন্ত্রমন্ত্র ছাড়াই প্রেম সাগরে ডুব দিয়ে বাঁশিওয়ালার দিদার লাভ করবেন। তাঁর কাছ থেকে উপহার স্বরুপ আনবেন নৌকা ভরে হিরা লাল পান্না সোনা।


তথ্যসূত্র