মনের মধ্যে এক বনফুল আছে, রুহ নামক সেই ফুল নিয়ে ওলি-আউলিয়া সাধকদের দুই দমের 'পাছ-আনপাছ' খেলা। তাঁরা নয় দরজা বন্ধ করে সেই ফুলের গন্ধ নেন। শেখ ভানু দেহ নামক নিকুঞ্জ মন্দিরের চল্লিশটি ভাগে তা খুঁজেছেন, হাত জোড় করে "ওঁ অবস্ত্র" মন্ত্র জপে অশ্রুধারা বহিয়েছেন, কিন্তু নিকুঞ্জ মন্দিরের ভিতরের ঘরগুলোয় তালা আছে। তাছাড়া মন্দিরের রাজদুয়ারে সাঁপের পাহারা আছে, যে সাঁপ প্রায়ই ছোবল মারে দরজায়। এসব কারণে শেখ ভানু নিকুঞ্জ মন্দিরে প্রবেশ করে বন্ধুর দেখা পাননি। ফলে বৃথা গেছে শেখ ভানুর সাধন ও ভজন। যমের কলে চাবি দিয়ে গভীর রাতে নতশিরে আসন করে প্রদীপ জ্বেলে প্রেমের আরাধনা করেন সাধু মহাজনেরা। দেহ নামক স্ফটিকনির্মিত মহলে ঘরের মধ্যে ঘর আছে, নয়টি দ্বারে নয়টি রত্ন আছে, মেঘ ঘনিয়ে আসলেই দরজাসমূহে তালা ঝোলে। কালেমার চাবি মেরে তা খুলতে করতে হয়। ভেলভেট কাপড়ের তাঁবু খাটানো আছে। আজব এই মহলের মধ্যে আছে স্ফটিকের ঝাড়বাতি। এ ঘরে আছে একটি চন্দ্র ও একটি সূর্য। এছাড়া রয়েছে অগণিত তারা। এর দক্ষিণ পাশে মৌলার বরজখ, যা ডানে থেকে বামে খেলে এবং প্রেমিকের সঙ্গে মিশে চাঁদের প্রসার ঘটায়। এ মহলের আট কুঠুরি নয় দরজায় চন্দ্র চলাচল করে। এ ঘরে আছে মাটির তৈরী একটি খাট, তাতে আছে কাজল কোঠা, সেখানে গোপনে ভ্রমর এসে কোটি কোটি ফুল ফুটিয়েছে। সেই বাগানের অলি ধরতে পারলেই সাধকের জীবন সফল হয়। সেখানে ডাল পাতা বৃক্ষ ছাড়া একটি ফুল ফোটান সাঁই, যা দেখতে চাঁদের ছটার মতো। সে ফুলের সুগন্ধে মোহিত হয়ে ভ্রমরা মধুপানের জন্য আকুল হয়ে যায়। এ ফুল ধরতে গেলে ধরা দেয়না, আপনা আপনি বাইরে আসে। ভ্রমর হয়ে হৃদমন্দিরে সেই ফুল ফোটা (পূর্ণশশী) যে দেখেছে তাঁর জীবন সফল হয়েছে। তাঁর শমনের ভয় দূর হয়েছে। সে রূপ বিজলীর ন্যায় তেজোদ্দীপ্ত। কিন্তু সে ফুল ফোটা দেখতে হলে কামিনী রুপী সাঁপিনীর প্রতি আসক্তি ছেড়ে দিয়ে নয়নজলে বস্ত্র গলিয়ে উপাসনা করতে হবে। কামে নয়, গুরুর দেখানো পথে তারে তারে তাল মিশিয়ে, প্রেমের মরা হয়ে, প্রেমের সুতায় গেঁথে সেই চাঁদ ধরতে হবে। চোখ বন্ধ করে দিলের বাতি জ্বেলে সর্বদা নিরীক্ষণ করে কলের সাহায্যে তাকে ধরতে হয়। রঙ্গের বাজারে সে রূপের উদয় হয়। চোখ খোলা থাকলে ভবের মায়া সে রূপের উপরে ছায়া ফেলে বলে সে রূপ পরিস্কার দেখা যায়না। শেখ ভানুর চিত্তে ভক্তি না থাকায় প্রেম রসে শৃঙ্গার ঘটাতে পারেননি তিনি। বৈশাখে কুঞ্জের তালা তিনি খুলতে পারেননি, তাই তাঁর বিহার হয়নি নানা জাতি ফুল ফুটে থাকা প্রেম কাননে। ভ্রমরের ন্যায় ফুলে ফুলে বিরাজ করে পান করতে পারেননি ফুলের মধু। জ্যৈষ্ঠ মাসে ফল পাকে। বুলবুল পাখিরা তাদের মাশুক আম কাঠাল কলাকে খুঁজে বেড়ায়। পেলে তাঁদের মন শান্ত হয়। শেখ ভানু তাঁর আঁধার ঘরে জ্ঞানের বাতি জ্বালেননি বলে নিজের মাশুককে দেখতে পাননা। আষাঢ় মাসে তিনি বিরণী ধানের খই স্বর্ণের থালায় মেখে নিয়ে কানাইয়ের জন্য অপেক্ষা করেন, কিন্তু তাঁর হৃদয়ের মধ্যবর্তী কুচিন্তার বাজারে অনেক শোরগোল। এত হৈচৈয়ের মধ্যে তিনি কানাইকে হারিয়ে ফেলেছেন। শাওন মাসে উত্তাল জলতরঙ্গে পরপারে বন্ধুর কাছে যেতে কোনো খেয়া পাননা তিনি। তাই কুলে বসে ঝরঝর করে অশ্রুবর্ষণ করেন। দুঃখে মরে ভেসে উঠতে চান যমুনার জলে। শেখ ভানু জলের ছলে ঘাটে গিয়েছিলেন চাঁদ দেখতে, কিন্তু গঙ্গার জলে ঢেউ লেগে পদ্মফুলের ন্যায় ভাসমান সে অধর চাঁদ জলে মিশে যায়। সে চাঁদ দেখতে চার রঙের এক ফুলের মতো। তাতে আছে কালো, সাদা, লাল আর হলুদ রঙের মিশ্রণ। সত্য প্রেমের প্রেমিক নন বলে শেখ ভানু জলপরী মনে করে তাঁর সাথে ডুব খেলেন। তনের মধ্যে ঢেঁকি বাওয়ার সময় হুশ করে দ্বিদমে পাছ-আনপাছ সহযোগে উঠতে "আল্লা" এবং পড়তে "হু" উচ্চারণ করেন না বলে তিনি কেবল তুষ পান। আকাঠা কাঠের ঢেঁকি হওয়ায় এবং কালেমা ছাড়া ঢেঁকি বাওয়ায় তাঁর দম বিফলে যায়, হাশরে ত্বরার কোনো আশা থাকেনা। যে চমৎকার রূপ দেখলে গৃহে ফিরে যাওয়ার কথা ভুলে, জ্ঞান হারিয়ে সাধকগণ আপন রূপে আপনি মগ্ন হয়ে পড়েন, সেই বন্ধুর চাঁদবদনী রূপ তিনি দেখতে পাননা। রূপের ভরা ডুবে যায় সাগরে। অথচ সাধু মহাজনেরা অল্প জলে বড়শি ফেলে কমলের মৌ পান করেন। ভাদ্র মাসে যখন গাছে তাল পাকে, তখন কদম্বতলা থেকে ভেসে আসা বাঁশির সুরে পাগলিনী হয়ে ওঠেন শেখ ভানু। কিন্তু তাঁর দুঃখের কপাল বলে বন্ধুর দেখা পাননা। আশ্বিন মাসে যখন গাঙ্গে চর পড়ে, তখন নিরলে অন্ধকার রাতে ফুলের শয্যা সাজিয়ে শেখ ভানু বন্ধুর আশায় বসে বসে কাঁদেন। বন্ধুকে না দেখে শেখ ভানুর অঙ্গ অসার হয়ে আসে। কার্তিক মাসে যখন ভাটির দিকে জোয়ার বয় তখন শেখ ভানু ধরেই নেন যে বন্ধুর দেখা পাওয়া তাঁর ভাগ্যে নেই। বিচ্ছেদের জ্বালায় ধীরে ধীরে জ্বলতে থাকেন তিনি। ভাবেন, পথ চেয়েই তাঁর জীবনটা কেটে গেলো বুঝি। আগন মাসে যখন নানা জাতের ধান পাঁকে, তা দেখে কিষাণেরা আনন্দিত হয়। কিন্তু শেখ ভানুর অন্তর তখনও ঘুনে কেঁটে চলেছে। দুঃখের আগুন তখনও ধিকি ধিকি জ্বলছে তাঁর অন্তরে। পৌষ মাসের অন্ধকার রাতে তিনি একলা বসে কাঁদেন আর ভাবেন, বেঁচে থাকতে যদি বন্ধুর দেখা না পান, মরলে কি আর পাবেন? মাঘ মাসে শীতে তার অঙ্গ কাঁপে, তবু বন্ধুর জন্য তাঁর প্রাণ বিদীর্ণ হয়। দিলের দরদী, নয়নের জ্যোতি, দমের দুর্লভ ও বিপদের সেই সাথীর দেখা তিনি পাননা। ফাল্গুন মাসে ডালে বসে যখন কোকিল ডাকে, তখন শেখ ভানু মনে করেন ঐ কোকিলই বুঝি তাঁর বিনোদিয়া। কুলনাশিনী সেই কোকিলকে তিনি ধরতে চান। কিন্তু সেই কোকিলের হাত নেই, পাও নেই, বিনা পাখায় ওড়ে বলে তাঁকে কেউ ধরে দিতে পারেনা। চৈত্র মাসে বছর শেষ হয়ে আসে বন্ধুর দেখা না পাওয়া গেলেও চক মেলার বাজারে বসে শোনা যায় কদমতলে বসে বাজানো বন্ধুর বাঁশির ধ্বনি। তা শুনে শেখ ভানু ঘরের জল বাহিরে ফেলে জলের ছলে ছুটে যেতে চান কদম্বতলায়। কিন্তু কাল ননদী তাঁকে যেতে দেয়না। তিনি বোঝেন, সুখ ত্যাগ করে দুঃখ সইতে পারলেই কেবল মাশুকের সঙ্গে মিলন সম্ভব। তাই মহলের উর্দ্ধ এবং পাতালের ঘরে সাধক শেখ ভানু দমের সঙ্গে "আল্লাহু" নামের জিকির করেন। অন্তরে বন্ধের নাম না জপলে শাশুড়ি ননদী জা (রিপুগণ) তাকে গ্রাস করবে। তিনি ঝাঁপ দেবেন বেগমসিন্ধু (নারী) নামক গভীর, রহস্যময় সর্বগ্রাসী সাগরে। তত্ত্ব জেনে রিপু দমন না করলে মনের মানুষের দেখা পাওয়া যাবেনা। তাই গুরুর সন্ধানে শেখ ভানুর মন চঞ্চল হয়ে আছে। দেহের কোন জায়গায় রুহ থাকে, তা একমাত্র পীরই তাঁকে দেখিয়ে দিতে পারেন। দিল দরিয়ায় ডুব দিলে মুর্শিদের দিদার পাওয়া যাবে। মুর্শিদের চরণে জ্যান্তে মরা হয়ে পড়ে থাকলে ষোল আনা কর্ম সারা হবে। সে দরিয়ায় আছে চোদ্দটি বাঁক, তাতে আছে একটি দ্বার। আছে চারটি টিলা, সেখানে সর্বদা উজানে স্রোত বয়। শেখ ভানুর জীবন প্রায় শেষ হয়ে এলো, কিন্তু মানুষের কথা শুনে গাফিলে ঘরে বসে থাকায়, তিনি সেই অমূল্যরতন মনের মানুষের দেখা পেলেন না। বেঁচে থাকতে দেখা না পেলে মৃত্যুর পর আর কি দেখা পাওয়া যাবে? তাই হতাশ শেখ ভানু সখীগণকে সাথে নিয়ে বাজার ভাঙার আগেই (রূপ যৌবন থাকতে থাকতেই) প্রেমের বাজারে গিয়ে বিনামূল্যে পঞ্চরসের ধন ক্রয় করতে চান গুরুর দোকান থেকে। শেখ ভানু প্রেমের বাজার থেকে হীরালাল পরশমণি, রত্ন-কাঞ্চন ইত্যাদি কিনবেন বলে মহাজনের পুঁজি [চারটি পরশ {স্থূল (আব, আতশ, খাক, বাত)}, ছয়টি গহর {সুক্ষ্ম (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য)}] সহকারে তাঁর চৌদ্দ পোয়া (সাড়ে তিন হাত) নৌকা (দেহ) নিয়ে যাত্রা করেছেন। সাঁই তাকে নৌকা, বৈঠা আর মাঝি দিয়েছেন। আর দিয়েছেন পঞ্চকুড়ি (দুই হাত, পাঁচটি করে আঙ্গুল ও কুড়িটি করে কড়) ষোলোজন পাহারাদার (চার কুতুব বা চারটি বৃদ্ধাঙ্গুলি বাদে হাত পায়ের ষোলোটি আঙ্গুল)। আর একটি বস্তু দিয়েছেন যার ছেচল্লিশটি নাম। আর পরামর্শ দিয়েছেন পথ চিনে, সবসময় তীরের পানে লক্ষ্য রেখে নৌকা পরিচালনা করতে। হাইলকাটা পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব অর্পণ করেছেন ভানু বেপারীর উপরে। কিন্তু তাঁর আছে ভাবের ব্যারাম, ভাবতে ভাবতেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন তিনি। এই রোগের কোনো ঔষধ প্রেমের গুরু মহাজন তাকে দেননি। শুধু বলে দিয়েছেন, তনের গুরু মন, আর মনের গুরু পবন। কিন্তু তত্ত্ব না বুঝে মত্ত হয়ে জ্বালাতন সইতে হচ্ছে শেখ ভানুকে। তিনি স্বপ্নে মানিক পেলেও জাগরণেই হারিয়ে ফেলেন তা। এদিকে, নদীর তরঙ্গ দেখে মাঝি পালিয়ে যেতে উদ্যত। সামনে পড়েছে তিন দ্বার বিশিষ্ট ত্রিবেণী ঘাট। এ ঘাট পার হওয়া বড়ই মুশকিল। এখানে মন বাতাসে যদি ঢেউ ওঠে, অর্থাৎ কামনার বশবর্তী হয়ে যান তাহলে মহাবিপদ। তাই তিনি শীঘ্রই মূলস্রোত থেকে সরে গিয়ে পার্শ্ববর্তী গৌণ স্রোতে (খাড়ি) চালাতে চান নৌকাটি। তা নাহলে নৌকা ভাটিতে গিয়ে নিলক্ষীয়ার বালুচরে ঠেকবে। ঠেকলেই রঙ্গ মন্দির উজাড় করে শমন তাঁকে বেঁধে নিয়ে যাবে। লস্কর এসে চারটি পরশ লুটে নিয়ে যাবে। লাভে মূলে তল হবে নৌকা। শুয়া পাখি (প্রাণ) উড়ে যাবে। দেহ হবে শূন্যকার। স্ত্রী-পুত্র কান্নাকাটি করলেও ফেরাতে পারবেনা তাকে। দেহ নৌকাটি সারি সারি গোড়া বিশিষ্ট। একটি জাঙ্ঘা তাকে টেনে রাখে। হাইলের কাটা বা হরকা (গুরুস্মরণ) ঠিক না রাখলে এ নৌকা বেকায়দায় পড়ে ত্রিপিনি ঘাটে ডুবে যাবে। তাই এ নৌকা এক দাঁড়ে বা দুই দাঁড়ে বাওয়া যাবেনা। বাইতে হবে পঞ্চ দাঁড়ে (পঞ্চ ইন্দ্রিয় সহযোগে)। দম ফুরিয়ে গেলে আর বন্ধুর দিদার পাওয়া যাবেনা। প্রেমানলে শেখ ভানুর অঙ্গ জ্বলে ছারখার হলেও, তিনি চিন্তামণি নামক প্রেমের ধ্বনি শুনতে পাননি বলে আজো দমের সঙ্গে মিলন হলোনা তাঁর। তিনি কেবল গুবড়ে পোকার মতো অঙ্গে ফোঁটা, মাথায় জটা নিয়ে সাধুর বেশে দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ান কুলের বউদেরকে ভুলানোর জন্য। কিন্তু প্রেম পান না। তাই তার দুঃখ রইলো চিরকাল। প্রেম তো সস্তা নয় যে গাছে ধরবে। শুধুমাত্র খালেছ দিলে যারা "ইল্লাল্লাহ" জিকির করবে, তাদের দিলের ভাবনা যাবে। কলির যোগে তাঁরাই লা মোকামে গিয়ে কপাট খুলে বন্ধুর দরশন পাবে। মরণকালে রাসুল তাঁদের কোলে নেবে, আল্লাহর নাম তাঁদের স্মরণ হবে।