বেরিং প্রণালী
Bering Strait
এশিয়া মহাদেশের পূর্বপ্রান্ত (রাশিয়া)
ও উত্তর আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তের (আলাস্কা) মধ্যবর্তী একটি প্রণালী। এই কারণে একে কোনো
মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। এই প্রণালীর এশিয়ার অংশটি রাশিয়ার মালিকানাধীন এবং উত্তর আমেরিকা
অংশটি যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন।
বেরিং প্রণালীর
স্থানাঙ্ক: অক্ষাংশ : ৬৬° উত্তর (প্রায়)। দ্রাঘিমাংশ: থেকে ১৬৮° থেকে ১৭৯° পশ্চিম
(প্রায়)।
এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার মধ্যবর্তী এই প্রাণলীতে আছে দুটি দ্বীপ। এই দ্বীপের
মধ্যবর্তী অংশটির উপর দিয়ে চলে গেছে উভয় মহাদেশের বিভাজক রেখা। এই দুটি দ্বীপকে বলা
হয়-
- বিগ ডায়োমিড (Big Diomede): এটি এশিয়া মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত (রাশিয়া)।
- লিটল ডায়োমিড (Little Diomede): এটি উত্তর আমেরিকা মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত (যুক্তরাষ্ট্র)।
উল্লেখ্য এই দুই দ্বীপের মাঝখানের দূরত্ব মাত্র ৩.৮ কিলোমিটার।
তাই বলা হয় এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকা মহাদেশের মধ্যে দূরত্ব মাত্র ৩.৮ কিলোমিটার! সময়ের ব্যবথান ২১ ঘণ্টা!। এই সময়ের পার্থক্যের কারণে দ্বীপ দুটির বিশেষ ডাকনাম রয়েছে:
- বিগ ডায়োমিড (রাশিয়া): একে বলা হয় "আগামীকালকের দ্বীপ"
(Tomorrow Island)। কারণ এটি আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার পশ্চিমে অবস্থিত এবং সময়ের হিসেবে এগিয়ে।
- লিটল ডায়োমিড (যুক্তরাষ্ট্র): একে বলা হয় "গতকালের দ্বীপ"
(Yesterday Island)। কারণ এটি তারিখ রেখার পূর্বে অবস্থিত এবং সময়ের হিসেবে পিছিয়ে।
এখানে আন্তর্জাতিক তারিখ
আঁকাবাঁক রাখা হয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা (১৮০° দ্রাঘিমাংশ) সাধারণত সোজা হওয়ার কথা থাকলেও এই অঞ্চলে এসে তা দ্বীপ দুটির মাঝখান দিয়ে কিছুটা এঁকেবেঁকে গিয়েছে। এর কারণ হলো- যাতে রাশিয়ার পুরো অংশটি একই সময়ের অধীনে থাকে (বিগ ডায়োমিড রাশিয়ার অংশ), আমেরিকার আলাস্কা অঞ্চলটি একই তারিখের অধীনে থাকে (লিটল ডায়োমিড আমেরিকার অংশ)। যদি এই রেখাটি সোজা হতো, তবে একই দেশের ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপে ভিন্ন ভিন্ন তারিখ থাকত, যা প্রশাসনিক কাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত।
শীতকালে যখন বেরিং প্রণালীর পানি জমে বরফ হয়ে যায়, তখন এই দুই দ্বীপের মাঝে একটি "বরফের সেতু" তৈরি হয়। তাত্ত্বিকভাবে, এই বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে মাত্র ২০ মিনিটে এক দিন থেকে অন্য দিনে (গতকাল থেকে আগামীকাল) চলে
যাওয়া যায়। তবে সীমান্ত আইন এবং নিরাপত্তার কারণে এটি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
মানুষের জীবনযাত্রা
- বিগ ডায়োমিড: এখানে কোনো স্থায়ী সাধারণ জনবসতি নেই। এটি মূলত রাশিয়ার একটি সামরিক ঘাঁটি এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- লিটল ডায়োমিড: এখানে একটি ছোট গ্রাম রয়েছে যেখানে প্রায় ৮০-১০০ জন ইনুইট আদিবাসী বসবাস করেন। তারা মূলত মাছ শিকার করে জীবনধারণ করেন।
বিগ ডায়োমিড এবং লিটল ডায়োমিড দ্বীপ দুটির মধ্য দিয়ে যাতায়াত ও বাণিজ্যের ইতিহাস অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। একসময়
এই দুই দ্বীপের বাসিন্দারা একই পরিবারের মতো ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়।
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে আদিবাসীদের অবাধ যাতায়াত করতো। তারও অনেক আগে এই পথ ধরে-
আদিম মানুষ খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৩০হাজার অব্দের দিকে এশিয়া থেকে আমেরিকা মহাদেশে পা
রেখেছিল।
এই দুই দ্বীপে ইনুইট বা এশীয় এস্কিমোরা বাস করত। তাদের কাছে কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্ত ছিল না।
তারা চামড়া, পশুর মাংস এবং পাথরের তৈরি জিনিসপত্র বিনিময় করত।
এক দ্বীপের মানুষ অন্য দ্বীপে বিয়ে করত এবং উৎসব পালন করতে বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে বা নৌকায় যাতায়াত করত। শীতকালে সমুদ্র জমে গেলে তারা স্লেজ গাড়িতে করে যাতায়াত করত।
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের শীতল যুদ্ধের সময় পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে।
তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বিগ ডায়োমিড দ্বীপটিকে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ঘোষণা করে।
সোভিয়েত সরকার বিগ ডায়োমিডের স্থানীয় আদিবাসীদের সরিয়ে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডে পাঠিয়ে দেয় এবং দ্বীপে শুধু সামরিক বাহিনী মোতায়েন করে।
দুই দ্বীপের যাতায়াত পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়। বার্লিন দেয়ালের মতো এই জলসীমাকে তখন "আইস কার্টেন"
(Ice Curtain) বলা হতো।
এর ফলে অনেক পরিবার একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
লিন কক্সের ঐতিহাসিক সাঁতার: শীতল যুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে এবং দুই দেশের মধ্যে শান্তির বার্তা দিতে ১৯৮৭
খ্রিষ্টাব্দে অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে। মার্কিন সাতারু লিন কক্স
(Lynne Cox) লিটল ডায়োমিড থেকে বিগ ডায়োমিড পর্যন্ত সাঁতার কেটে পার হন।
উত্তর মহাসাগরের বরফ শীতল পানিতে (প্রায় ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস) মাত্র ২ ঘণ্টার মধ্যে তিনি ৩.৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন।
লিন কক্স যখন সাঁতার কেটে ওপারে পৌঁছান, তখন রুশ সৈন্যরা তাকে স্বাগত জানাতে গরম চা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল!
এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। তৎকালীন সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান লিন কক্সের এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানান, যা দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা শিথিল করতে সাহায্য করেছিল।
বর্তমানে এই দুই দ্বীপের মধ্যে কোনো সরাসরি বাণিজ্যিক পথ নেই।
লিটল ডায়োমিডে আমেরিকান দোকান থেকে কেনা পণ্য ব্যবহার করা হয়, যা আলাস্কা থেকে হেলিকপ্টারে করে আসে। বিগ ডায়োমিড মূলত একটি জনশূন্য সামরিক কেন্দ্র।
বর্তমানে অনুমতি ছাড়া এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাওয়া আইনত অপরাধ। যদিও আদিবাসী পরিবারগুলো আবার যাতায়াতের সুযোগ পাওয়ার জন্য দীর্ঘকাল ধরে আবেদন জানিয়ে আসছে।
বেরিং ল্যান্ড ব্রিজ টানেল (একটি স্বপ্ন)
অনেক বছর ধরে ইঞ্জিনিয়াররা প্রস্তাব করে আসছেন যে, এই দুই দ্বীপকে স্টেশন হিসেবে ব্যবহার করে এশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে একটি আন্ডারওয়াটার টানেল তৈরি করা হোক। যদি এটি তৈরি হয়, তবে লন্ডন থেকে নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত ট্রেনে বা গাড়িতে যাতায়াত করা সম্ভব হবে। তবে বিশাল খরচ এবং রাজনৈতিক কারণে এটি এখনও সফল হয়নি।