জ্যাকপট
ইংরেজি :
Operation Jackpot
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের
সময় পাকিস্তানি নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সফলতম গেরিলা আক্রমণ। ১৯৭১
খ্রিষ্টাব্দের ১৫ আগষ্ট দিবাগত রাত ১২টার পর, ১৬ আগষ্ট প্রথম প্রহরে প্রায় একই সময় চট্টগ্রাম,
চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জে আক্রমণ করে । এই অপারেশনের অধীনে ভোর চারটায় অপর একটি দল মংলা সমুদ্র বন্দর আক্রমণ করে। এই
গেরিলা আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর বহু অস্ত্র ও রসদবাহী জাহাজ ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ও
ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজগুলোর মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্যকারী অনেকগুলো বিদেশি
জাহাজও ছিল।
আক্রমণের প্রেক্ষাপট
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের
মার্চের শুরুর দিকে, পাকিস্তানি সাব-মেরিনারদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য, পাকিস্তানি সাবমেরিন পিএন.এস.ম্যাংরো ফ্রান্সের তুলন সাবমেরিন
ডকইয়ার্ডে যায়। ওই সবামেরিনের ৪১ জন
যোদ্ধাদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাঙালি। ২৫ মার্চ দিবাগত রাত্রি ১২টার পর পাকিস্তানি
সেনাবাহিনী কর্তৃক ঢাকাতে ব্যাপক গণহত্যার কথা শুনে, বাঙালি সৈন্যরা বাংলাদেশে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৮জন ৩০শে মার্চ
তাঁরা বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ১৯৭১
খ্রিষ্টাব্দের ৯ এপ্রিল এঁরা দিল্লিতে এসে
পৌছান। এই বাঙালি সৈন্যরা ছিলেন
রহমতউল্লাহ, মোঃ সৈয়দ মোশাররফ হোসেন, মোঃ শেখ আমানউল্লাহ, মোঃ আবদুল ওয়াহেদ
চৌধুরী, মোঃ আহসানউল্লাহ, মোঃ আবদুর রকিব মিয়া, মো আবদুর রহমান আবেদ এবং মোঃ বদিউল আলম।
এদেরকে নিয়ে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের জন্য একটি দল তৈরি করা
হয়। পরবর্তী সময়ে এই দলে আরও ১২জন যোদ্ধাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর ২০ জনের এই
দলটিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে একটি ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করা হয়। এরপর বাংলাদেশ
সেনাবহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল
ওসমানীর সাথে এদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এই সময় কর্নেল ওসমানী একটি নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।
কর্নেল
ওসমানীর নির্দেশে একটি নৌ-কমান্ডো সেক্টর খোলা হয়। এরপর বাছাইকৃত গেরিলাদের
প্রশিক্ষণ দেয়ার
জন্য ভারতের পশ্চিমবাংলার পলাশীর স্মৃতিসৌধের পাশে, ভাগীরথী নদীর তীরে, ১৯৭১
খ্রিষ্টাব্দের ২৩ই মে একটি গোপন প্রশিক্ষণ শিবির খোলা হয়। এই প্রশিক্ষণ শিবিরের সাংকেতিক নাম
ছিল
সি-২ পি (C-2 P)।
এখানে প্রশিক্ষণের জন্য অন্যান্য সকল সেক্টর থেকে
প্রায় ৩০০জন যোদ্ধা সংগ্রহ করা হয়। উল্লেখ্য, এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় অত্যন্ত
গোপনীয়ভাবে।
প্রশিক্ষণ শুরু হবার আগেই বাছাইকৃত যোদ্ধাদের বলে দেয়া হয় যে, এটি হবে একটি আত্মঘাতী
যোদ্ধাদল। তাই প্রশিক্ষণের শুরুতেই প্রত্যেক
প্রশিক্ষণার্থীদের ছবিসহ একটি সম্মতিসূচক ফর্মে স্বাক্ষর নেয়া হয়। এই ফর্মে লেখা
ছিল যে, 'আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ
গ্রহণ করছি, আর যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না'।
এই নৌ-কমান্ডোদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় নৌবাহিনী অফিসার কমান্ডার
এম.এ.,সামানত, এম.ভি.সি ও ট্রেনিং দেয়ার দায়িত্বে ছিলেন লেঃ কমান্ডার জি এম
মার্টিস, ভি.আর.সি ও এন.এম। এছাড়া অতিরিক্ত অন্যান্য ভারতীয় ২০জন প্রশিক্ষক ছিলেন।
প্রশিক্ষকদের মধ্যে ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা ৮ জন বাঙালি সাব-মেরিনা যোদ্ধাও
ছিলেন।
প্রশিক্ষণের শেখানো হয় স্থলযুদ্ধ করার নানাবিধ কৌশল। এই কৌশলের ভিতরে ছিল−গ্রেনেড নিক্ষেপ,
নানা ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার, স্টেনগান, রিভলবার বা এই অস্ত্র চালানো এবং খালি হাতে
যুদ্ধ করার কোশল, চাকু জাতীয় অস্ত্র ব্যবহার, আত্মরক্ষরা কৌশল। একই সাথে বিশেষ
গুরুত্ব দিয়ে শেখানো জলযুদ্ধের
উপযোগী কৌশল। এই প্রশিক্ষণের মধ্যে ছিলে ৫-৬কেজি ওজনের পাথর বুকে বেধে সাঁতার, চিৎ-সাঁতার, কোন মতে পানির উপরে নাক
ভাসিয়ে একটানা অনেক্ষণ সাঁতার কাটার অভ্যাস, পানিতে শব্দ না করে সাঁতার করার কৌশল।
সহযোদ্ধার হাত ধরে সাঁতার কাটার কৌশল, ডুব-সাতাঁর দিয়ে জাহাজের তলদেশে দ্রুত লিমপেট মাইন
ব্যবহার করার কৌশল, স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতার কৌশল ইত্যাদি। জল-প্রশিক্ষণ দেওয়া
হতো খরস্রোতা ভাগীরথী নদীতে। একটানা ৪৮ ঘণ্টা পানিতে থাকার
অভ্যাসও করতে হয় সব যোদ্ধাকে।
প্রায় টানা তিন'মাস প্রশিক্ষণের পর আগস্টের প্রথম সপ্তাহে তাদের প্রশিক্ষণের
সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।
যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের শেষে, আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। এই উদ্দেশ্যে পুরো
দলকে চার সেক্টরের
সাজানো হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রথম ব্যাচকে চারটি স্থানে আক্রমণের
উদ্দেশ্যে মোট চারটি দলে ভাগ করা হয়। এই দলের ২টির প্রত্যেকটিতে ছিল ৬০ জন এবং অপর
দুটি দলের প্রত্যেকটিতে ছিল ২০ জন।
এই চারটি দলের লক্ষ্য ছিল চারটি বিশেষ স্থান। স্থানগুলো হলো−
গ্রুপ ১- কমান্ডার চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর: সাবমেরিনার আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী। সদস্য সংখ্যা: ৬০ । গন্তব্য: চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর'
গ্রুপ ২- কমান্ডার মংলা সমুদ্র বন্দর: নৌ- কমান্ডো আমিনুর রহমান,খসরু। সদস্য সংখ্যা: ২৬০। (৬০জন নৌ কমান্ডো ও ২০০ জন সি আন্ড সি কমাণ্ড )। গন্তব্য: মংলা সমুদ্র বন্দর
গ্রুপ ৩- কমান্ডার চাঁদপুর নদী বন্দর: সাবমেরিনার বদিউল আলম। সদস্য সংখ্যা: ২০ । গন্তব্যঃ চাঁদপুর নদী বন্দর ।
গ্রুপ ৪- কমান্ডার নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর: সাবমেরিনার আবদুর রহমান। সদস্য সংখ্যা: ২০ । গন্তব্য: নারায়ণগঞ্জ' নদী বন্দর।
এই চারটি দলের সদস্যরা তাঁদের দলনেতার গোপন
সঙ্কেতের মাধ্যমে চালিত হতেন। আর এসব সঙ্কেতের সাথে জড়িত ছিল, বাংলাদেশ সেনাবহিনীর
উচ্চ পদস্থ সুনির্দিষ্ট কিছু অফিসার, ভারতীয় সেনাবাহিনীর সুনির্দিষ্ট কিছু অফিসার।
সঙ্কেত প্রদানের জন্য যুক্ত করা আকাশবাণী'র কিছু কর্মকর্তা।
আক্রমণ পরিচালনার শুরুতে চারটি দলের দলনেতাদের বলা হয়েছিল যে, দুটি বাংলা গানকে
নির্দেশক বা সতর্ক
সঙ্কেত হিসেবে ব্যবহার করা হবে। গান দুটি প্রচার করা হবে কলকাতা আকাশবাণীর পক্ষ
থেকে পূর্বাঞ্চলীয় শ্রোতাদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠানে। প্রথম সঙ্কেত প্রচারিত হবে সকাল ৬টা থেকে ৬:৩০ মিনিটে বা
রাত ১০:৩০ মিনিট থেকে রাত ১১টায়। এই বেতার সম্প্রচারের রেডিও তরঙ্গ সম্পর্কে জানতো
শুধু দলনেতারাই। গান দুটির মধ্যে প্রথম গানটি হবে শিশুদের উপযোগী একটি গান। গানটি
ছিল−
আল্পনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের
গাওয়া
'আমার পুতুল আজকে
প্রথম যাবে শশুর বাড়ি'। এই গানটি শোনার পর যোদ্ধারা আক্রমণের জন্য চূড়ান্তভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ
করবেন। এই গানটি প্রচারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দ্বিতীয় সঙ্কেতসূচক গান প্রচার হবে। এই
দ্বিতীয় গানটি হবে পংকজ মল্লিকের গাওয়া একটি রবীন্দ্র সঙ্গীত। এই গানটি হলো−
'আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান'।
এই গানটি শোনার পর যোদ্ধারা যেকোনো ভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ চালাবে।
পরিকল্পনা অনুসারে এই দলগুলো তাঁদের নির্ধারিত স্থানের দিকের যাত্রা শুরু করেন পলাশীর হরিনা ক্যাম্প থেকে। যাত্রা করার সময় তাদেরকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র দিয়ে দেয়া হয়।
প্রত্যেক নৌ-কমান্ডোকে একটি করে লিমপেট মাইন, ছুরি, একজোড়া সাঁতারের ফিন, আর কিছু
শুকনো খাবার। প্রতি তিন জনের জন্য একটি করে স্টেনগান এবং কমান্ডরদের
দেয়া হয় একটি করে ট্রানজিস্টার। অপারেশনের সাম্ভাব্য দিন ধার্য করা হয়েছিল ১৯৭১
খ্রিষ্টাব্দের ১৫ আগস্ট।
চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশন
অপারেশন সময়: ১৫ আগষ্ট দিবাগত রাত্রি ১৬ আগষ্ট প্রথম
প্রহর।
কমান্ডার: সাবমেরিনার আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী। সদস্য
সংখ্যা: ৬০ ।
হরিনা ক্যাম্প থেকে যাত্রা করার পর,
কমান্ডার ৬০ জনের দলকে ২০ জন করে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেন। ১ ও ২ নম্বর দল তাদের পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে
চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট বেইজ ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এই দুটি দল যথা
সময়ে যথাস্থানে পৌঁছালেও তৃতীয় দলটি সময় মতো পৌঁছাতে পারেন নি। ফলে আক্রমণকারী
সদস্যের সংখ্যা ৪০ জনে দাঁড়ায়। ১৪ আগষ্ট তাঁরা প্রথম গানের সঙ্কেত পান। এই
সঙ্কেত পাওয়ার পর যোদ্ধারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কর্ণফুলী নদীর পূর্বতীরে চরলক্ষ্যায় তাদের
ক্যাম্পে পৌঁছান।
প্রথমে দুজন কমান্ডো জেলে সেজে মাছ ধরার ভান করে বন্দরে জাহাজের অবস্থান
পর্যবেক্ষণ করে বন্দরের অবস্থা সম্পর্কে কমান্ডারকে জানান।
১৫ই আগষ্ট কমান্ডার ওয়াহেদ চৌধুরী
রেডিওর মাধ্যমে চূড়ান্ত সঙ্কেত পান এবং অপারেশনের প্রস্তুতি হন।
তিনি প্রাথমিকভাবে ৩৯ জনকে তিনজনের ছোটো ছোটো ভাগে ভাগ করেন। এই অভিযানে
৮জন যোদ্ধা শেষ পর্যন্ত ভয় পেয়ে পিছিয়ে
যান। ফলে শেষ পর্যন্ত ৩১ জন এই অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। তনি সদস্য বিশিষ্ট এই
দলে একজন বাড়তি হলেও কমান্ডার একটি দলের সাথে বাড়তি একজন জুড়ে দেন।
কামান্ডার প্রতিটি দলের
কাছে প্রয়োজনীয় উপকরণ ভাগ করে দিয়ে আক্রমণের উপযোগী করে তোলেন। পরে প্রতিটি দলে
তিনটি করে লিমপেট মাইন দেন এবং প্রতিটি দলের জন্য সুনির্দিষ্ট জাহাজ ঠিক
করে দেন। এরপর এঁরা
আক্রমণের জন্য অগ্রসর হন।
বন্দরের সোজাসুজি পানিতে নামলে স্রোত
যোদ্ধাদের ভাসিয়ে জাহাজ থেকে দূরে নিয়ে যাবে। তাই তাঁরা বন্দর থেকে এক
কিলোমিটার উজানে হেঁটে গিয়ে পানিতে নামেন। ফলে আক্রমণের সময় কিছুটা পিছিয়ে যায়।
রাত ১টা ১৫মিনিটে তাঁরা
পানিতে নেমে জাহাজের উদ্দেশ্যে সাঁতরানো শুরু করেন এবং বেশ দ্রুততার সাথে
নির্ধারিত জাহাজসমূহের গায়ে মাইন লাগিয়ে সাঁতার কেটে সরে পরেন। রাত ১টা ৪০
মিনিটে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। তারপর একে একে সবগুলো মাইন বিস্ফোরিত হয়। এ সফল
অপারেশনে তিনটি বড় অস্ত্রবাহী জাহাজ ধ্বংস হয়ে যায়।
এম ভি হরমুজ। এটি ১৪ আগষ্ট চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। ৯৯১০ টন অস্ত্রসম্ভারবাহী এই জাহাজটি ১৩ নং জেটিতে নোঙর করা ছিল।
এম ভি আল-আব্বাস। এটি ১০৪১৮ টন সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে ৯ আগষ্ট ১২ নং জেটিতে অবস্থান নেয়।
ওরিয়েন্ট বার্জ নং ৬ । এটি ৬২৭৬ টন অস্ত্র,গোলাবারুদ নিয়ে ফিস হারবার জেটির
সামনে অবস্থান করছিল
মংলা সমুদ্র বন্দর অপারেশন
অপারেশন সময়: ১৬ আগষ্ট ভোর ৪.৩০ মিনিট।
কমান্ডার: কমান্ডো আমিনুর রহমান,খসরু। সদস্য
সংখ্যা: ২৬০। এদের ভিতর ৬০জন নৌ কমান্ডো ও ২০০ জন সি আন্ড সি কমাণ্ড ।
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে জুলাই, এই দল ভারতের পোরট কানিং মাতলার থেকে মংলা অপারেশনের
উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। এঁরা সুন্দরবনের গভীর জঙ্গল পাড়ি দিয়ে ১৩ই আগষ্ট
সন্ধ্যা ৬টায় মংলা বন্দরে পৌঁছান। ২৬০ জনের কমান্ডো দলটি মংলা
বন্দর ও ডাংমারি বিলের পিছনে একটি পরিত্যাক্ত জমিদার বাড়িতে আশ্রয় নেন। রেডিওতে
সুনির্দিষ্ট সময় অন্তর গান দুটি শুনে এরা আক্রমণের উদ্যোগ নেন। এই আশ্রয়স্থল
থেকে থেকে এঁরা মংলার ডাংমারি বিলের মাঝ দিয়ে নৌকা যোগে ৬ মাইল পথ অতিক্রম
করেন। এই যাত্রায় এঁদের সময় লাগে প্রায় ১ঘণ্টা। এরপর এঁরা একটি প্রার্থনা সভায়
বসেন। এই সভায় তাঁরা নিজেদের জন্য গায়েবি জানাজা পড়েন। এই জানাজা শেষে এঁরা
আল্লাহ`র কাছে স্বাধীনতা যুদ্ধের শহিদের ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল
অপারেশন সাফল্যের জন্য বিশেষ দোওয়া করেন। এরপর রাত ১২টায় কমান্ডোরা ১৫টি
নৌকায় মংলা বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। মংলায় পৌঁছোনোর শেষ সময়
নিরধারিত ছিল রাত ২টা। কিন্তু পথ পরিদরশকের ভুল পরিচালনায় কমান্ডোরা নিরধারিত
সময়ের অনেক পরে মংলা বন্দরে পৌঁছান। ১৬ আগষ্ট ভোর ৪.৩০ মিনিটে মংলা অপারেশন
শুরু হয়, অপারেশনের শুরুতে ২০০ জন সি আন্ড সি বিশেষ কমান্ডো দল, ভারি ও হাল্কা
মেশিন গান নিয়ে ৩ জনের ছোট ছোট দল তৈরি করেন। ফলে পুরো দলটি ৬৬টি উপদলে বিভক্ত
হয়। নৌ- কমান্ডোরা মংলা বাঁধের পিছনে অবস্থান নেন। অপারেশন চলাকালে, সি
আন্ড সি কমান্ডো দলের উপ -কমান্ডার জনাব রাজা ও জনাব খিজির জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌ-
কমান্ডোদের সহযোগিতায় মেশিন গান নিয়ে পশুর নদীর হাটু পানিতে নেমে আসেন। সময়ের
অভাবে শুধুমাত্র ২৪ জন নৌ- কমাণ্ডো এ অভিযানে অংশ নিতে পেরেছিলেন। ৬টি উপদলে বিভক্ত
হয়ে ২৪জন নৌ-কমান্ডো ৬ টি বিদেশী জাহাজে মাইন লাগান, ভোর ৬-৩০ মিনিট থেকে নৌ-
কমান্ডোদের লাগানো মাইন বিকট শব্দ করে ফাটতে শুরু করে। ৩০ মিনিটের মধ্যেই পাকিস্তান
বিমান বাহিনীর ৪টি বিমান মংলা বন্দরের উপরে ঘুরতে দেখা যায়। আক্রান্ত জাহজগুলির
মধ্য একটি সোমালিয়ান, একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, ২টি চীনের, ১টি জাপানি ও ১টি
পাকিস্তানি জাহাজ ছিল। এই আক্রমণে আক্রান্ত মোট ৬টি বিদেশী জাহাজই ধ্বংস হয় এবং
৩০,০০০ হাজার টন গোলা-বারুদ ও যুদ্ধের সরঞ্জাম সহকারে ধীরে ধীরে পশুর নদীতে
নিমজ্জিত হয়।

চাঁদপুর নদী বন্দর অপারেশন
অপারেশন সময়: ১৫ আগষ্ট দিবাগত রাত্রি ১৬ আগষ্ট প্রথম
প্রহর।
কমান্ডার: সাবমেরিনার বদিউল আলম। সদস্য সংখ্যা: ১৮ ।
গন্তব্য চাঁদপুর নদী বন্দর ।
হরিনা ক্যাম্প থেকে বিভিন্ন পথ ধরে এঁরা চাঁদপুরে আসেন। বেতার সঙ্কেত
অনুসারে, এঁরা ১৫ আগষ্ট দিবাগত রাত ১২টার পর ১৬ আগষ্ট রাত্রি প্রথম প্রহরে আক্রমণ শুরু
করেন। এ অপারেশনে অংশগ্রহণকারী ১৮জন
যোদ্ধাকে ৬টি ছোট দলে ভাগ করা হয়।
প্রতিটি দলে ছিল ৩জন করে সদস্য। এই অভিযানে মাইন বিস্ফোরণে ২টি স্টিমার, গমবাহী
একটি জাহাজ-সহ ছোট বড় আরো অনেকগুলো নৌযান ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর অপারেশন
অপারেশন সময়: ১৫ আগষ্ট দিবাগত রাত্রি ১৬ আগষ্ট প্রথম
প্রহর।
কমান্ডার: সাবমেরিনার আবদুর রহমান। সদস্য সংখ্যা: ২০ । গন্তব্য:
নারায়ণগঞ্জ' নদী বন্দর।
হরিনা ক্যাম্প থেকে বিভিন্ন পথ ধরে এঁরা নারায়ণগঞ্জ আসেন। বেতার সঙ্কেত
অনুসারে, এঁরা ১৫ আগষ্ট দিবাগত রাত ১২টার পর ১৬ আগষ্ট প্রথম প্রহরে আক্রমণ শুরু
করেন। এ অপারেশনে মোট
৪টি জাহাজ ও বেশ কয়েকটি নৌযান ধ্বংস হয়।
১৬ অগাষ্ট এর অপারেশনের পর, সকল কমান্ডো ভারতে ফেরত যায়।
এর পরে নৌকমান্ডোরা পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে এবং একযোগে অভিযান পরিচালনা পরিবর্তে
বিচ্ছিন্নভাবে আক্রমণের উদ্যোগ নেয়। এরপর থেকে মূলত ছোট ছোট দল পাঠানো হতো কিছু
নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানার জন্য।
মুক্তিবাহিনীর সেক্টর ৯ এর কমান্ডার মেজর জলিল, অগাষ্ট
মাসে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার প্রধান তাজউদ্দীন আহমদ কাছ থেকে একটি নৌ ইউনিট গড়ে
তোলার অনুমতি লাভ করেছিলেন। সেই মোতাবেক কমান্ডার এম এন সামান্থ এর
কাছে ৪টি গানবোটের জন্য আবেদন করেছিলেন। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে কোলকাতা বন্দর
ট্রাস্ট ২টি টহলযান (অজয় এবং অক্ষয়) মুক্তিবাহিনীকে দান করে। ৩৮ লাখ ভারতীয়
রুপি খরচায় নৌযান দুটি খিদিরপুর ডকইয়ার্ডে একমাস ধরে মেরামত করা হয়। পরবর্তী
সময়ে জাহাজ দুটিকে ২টি কানাডিয়ান ৪০X৬০ মিমি বোফর গান, ২টি হালকা ইঞ্জিন, ৮ টি
গ্রাউন্ড মাইন (ডেকের দুই পাশে চারটি করে) এবং ১১টি গ্রাউন্ড মাইন
দ্বারা সজ্জিত করা হয়। এই দুটি জাহাজের নাম দেয়া হয় বিএনএস পদ্মা এবং পলাশ। এতে
মোট ৪৪ জন নাবিক এবং ১২ জন নৌ-কমান্ডো ছিলেন। প্রথমদিকে জাহাজ দুটোর নেতৃত্বে
ছিলেন ভারতীর নৌবাহিনীর সদস্যরা। মুক্তিবাহিনীর কাছে জাহাজ দুটি পুরোপুরি হস্তান্তর করা
হয় ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ অক্টোবর। প্রবাসী বাংলাদেশে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ক্যাপ্টেন কামরুজ্জামানের উপস্থিতিতে কোলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট চেয়ারম্যান মিঃ পি কে
সেন জাহাজ দুটো কমিশন করেন। লেঃ কমান্ডার কেপি রায় এবং কে মিত্র ছিলেন জাহাজ দুটোর
কমান্ডে নিয়োজিত।
ভারতীয় নৌবাহিনীর ফ্রিগেট এর প্রহরায়, ১০ নভেম্বরের জাহাজদুটি সফলভাবে
মংলা বন্দরের প্রবেশমুখে মাইন আক্রমণ চালাতে সক্ষম হয়। তার পরদিনই ১১
নভেম্বর , তারা ব্রিটিশ জাহাজ "দ্যা সিটি অফ সেইন্ট এলব্যান্স" কে মংলা বন্দর থেকে
তাড়িয়ে দেয়।
অপারেশন জ্যাকপটে শহীদ হওয়া নৌ-কমান্ডোদের নাম:
কমান্ডো আব্দুর রাকিব, ফুলছড়ি ঘাট অপারেশনে শহীদ হন
কমান্ডো হোসেইন ফরিদ, চট্টগ্রামে দ্বিতীয় অপারেশন চলাকালীন সময়ে পাক বাহিনীর হাতে শহীদ হন। তিনি অপারেশনের সময় পাকিস্তানী আর্মির হাতে আটক হন এবং পরবর্তীতে পাক সেনারা তাকে ম্যানহোলে দেহের নিম্নভাগ ঢুকিয়ে মেরুদন্ড না ভাঙ্গা পর্যন্ত শরীর বেকিয়ে, নির্মমভাবে হত্যা করে ।
কমান্ডো খবিরউজ্জামান, ফরিদপুরের দ্বিতীয় অপারেশনে শহীদ হন
কমান্ডো সিরাজুল ইসলাম, এম আজিজ, আফতাব উদ্দিন এবং রফিকুল ইসলাম অপারেশন চলাকালীন নিখোঁজ হন ।
"জাতীয় বীর" খেতাব পাওয়া নৌ-কমান্ডোদের নাম
জনাব এ. ডাব্লিউ. চৌধুরী - বীর উত্তম
ডঃ শাহ আলম - বীর উত্তম
জনাব মাজহার উল্লাহ - বীর উত্তম
জনাব শেখ মোহাম্মদ আমিন উল্লাহ - বীর উত্তম
জনাব আবেদুর রহমান - বীর উত্তম
জনাব মোশাররফ হোসেইন - বীর উত্তম (পরে বাংলাদেশ সরকার তার খেতাবটি বাতিল করে)
মোহাম্মদ খবিরউজ্জামান - বীর বীক্রম
জনাব মমিন উল্লাহ পাটওয়ারী - বীর প্রতীক
জনাব শাহজাহান কবীর - বীর প্রতীক
জনাব ফারুক-এ-আজম - বীর প্রতীক
মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ - বীর প্রতীক
মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেইন - বীর প্রতীক
আমির হোসেইন - বীর প্রতীক
সূত্র :