বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেন

সেন রাজবংশের চতুর্থ ও পঞ্চম রাজা।

১১৭৯ খ্রিষ্টাব্দে
সেন রাজবংশের তৃতীয় রাজা  লক্ষ্মণসেন (১১৭৯-১২০৬ খ্রিষ্টাব্দ)-এর তাঁর পুত্রের নাম ছিল  বিশ্বরূপসেন এবং কেশবসেন। তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খিলজী ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে নদীয়া দখল করে নিলে, লক্ষ্মণসেন পূর্ববঙ্গে পালিয়ে যান। ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে লক্ষ্মণসেন-এর মৃত্যু হলে, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র বিশ্বরূপসেন রাজা হন। এরপর কেশনসেনও রাজা হয়েছিলেন। তবে তাঁদের রাজত্বকাল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। ধারণা করা হয় দক্ষিণ ও পূর্ববাংলা তাঁরা শাসন করতেন। তাঁদের রাজত্বকালের তিনটি তাম্রশাসন পাওয়া যায়। এগুলো হলো  ১. বিশ্বরূপসেনের সাহিত্য-পরিষৎ লিপি, ২. বিশ্বরূপসেনের মদনপাড়া লিপি ও ৩. কেশবসেনের ইদিলপুর লিপি।

কেশবসেনের ইদিলপুর তাম্রশাসন

তাম্রশাসনগুলিতে বিশ্বরূপসেন ‘অরিরাজ বৃষভাশঙ্কর গৌড়েশ্বর’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। তাঁরা উভয়েই সূর্যের উপাসক ছিলেন। তাঁদের তাম্রশাসনে উভয়েই ‘যবনামড়বয়-প্রলয়-কালরুদ্র বলে অভিহিত হয়েছেন। এতে ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন যে, তাঁরা উভয়েই পশ্চিম, পশ্চিম-উত্তর বাংলার মুসলিম রাজ্যের আক্রমণ প্রতিরোধে সাফল্য অর্জন করেছিলেন। কারণ বাংলার পশ্চিম, পশ্চিম-উত্তরাংশ দখল করার পর দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় তুর্কি আগ্রাসন স্বাভাবিক ছিল। ঐতিহাসিক মিনহাজের বর্ণনায় এর সমর্থন পাওয়া যায়। সুতরাং বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেন তুর্কি আক্রমণ প্রতিহত করে স্বরাজ্য অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

ধারণা করা হয়, এই দুই ভাই প্রায় ২৫ বৎসর পূর্ববঙ্গে রাজত্ব করেছেন। বিশ্বরূপসেনের তাম্রশাসনে সূর্যসেন ও কুমার পুরুষোত্তম সেনের নামের উল্লেখ আছে। সম্ভবত এঁরা বিশ্বরূপসেনের পুত্র ছিলেন। তবে তাঁদের কেউ রাজত্ব করেছিলেন কিনা তা জানা যায় না। ঐতিহাসিক মিনহাজ যে সময় লক্ষ্মণাবতীতে আসেন (১২৪৪-৪৫ খ্রিষ্টাব্দে) তখনও লক্ষ্মণসেনের বংশধরগণ পূর্ববাংলায় রাজত্ব করছিলেন। সুতরাং মনে হয় কেশবসেনের পরেও একাধিক সেনরাজা পূর্ববাংলায় রাজত্ব করেছিলেন।

রাজা দশরথদেবের আদাবাড়ি তাম্রশাসন হতে জানা যায় যে, ত্রয়োদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সেন শাসনের পতন ঘটেছিল এবং সেন শাসনের কেন্দ্রস্থল বিক্রমপুর দেববংশের হস্তগত হয়। বিক্রমপুর হতে প্রকাশিত এই তাম্রশাসনে রাজা দশরথদেবের নাম উল্লিখিত হয়েছে। তিনি পরমেশ্বর, পরমভট্টারক, মহারাজাধিরাজ, অরিরাজ দনুজ মাধব উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারাণীর বিবরণে উল্লিখিত সোনারগাঁয়ের দনুজ রায় ছিলেন সম্ভবত এই দশরথদেব। দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন তুগরিল খানের বিরুদ্ধে বাংলা অভিযানকালে এই দনুজ রায়ের সাহায্য গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং ত্রয়োদশ শতকের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে বাংলায় সেনবংশীয় রাজাদের শাসন চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।


সূত্র:
করতোয়া মাহাত্ম/ পি.সি. সেন- , ১৯২৯।
কেশবসেনের আদিলপুর তাম্রশাসনের শ্লোক নং- ১৩।
Statistical Account of Bengal, Vol VII/W.W. Hunter
বাঙালির ইতিহাস/সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/সুকুমার সেন।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খণ্ড- ১/ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
মিনহাজ-ই-সিরাজ: তবকাত-ই-নাসিরী (অনুবাদক: আবুল কালাম মোঃ যাকারিয়া)।
বাংলাদেশের ইতিহাস/রমেশচন্দ্র মজুমদার।
ভারতের ইতিহাস । অতুলচন্দ্র রায়, প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়।