প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধ
First Indochina War

প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর (১৯৩৯-১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ), ভিয়েৎনামের সমাজাতান্ত্রিক দল ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে জাপান উত্তর ফ্রেঞ্চ ইন্দোচীন (টনকিন অঞ্চল, উত্তর ভিয়েতনাম) দখল শুরু করে।
১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের   ২২-২৬ সেপ্টেম্বর জাপানি সৈন্যরা   ভিচি ফ্রান্সের (নাজি-নিয়ন্ত্রিত ফ্রান্স) সাথে চুক্তি ভঙ্গ করে ল্যাং সন এবং ডং ডাং-এ আক্রমণ করে। এটি ছিল সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ, যাতে জাপান বিজয়ী হয় এবং উত্তর ভিয়েতনামে ঘাঁটি স্থাপন করে। উদ্দেশ্য ছিল চীনকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা। এই সময় তারা চালের জমি ধ্বংস করে পাট (যুদ্ধকালীন উপকরণের জন্য) চাষ করতে বাধ্য করে। বিপুল পরিমাণ চাল জাপানি সেনাবাহিনীর জন্য মজুত করা হয় এবং জাপানে রপ্তানি করা হয়। কয়লা সরবরাহ বন্ধ হলে চালকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ জুলা, জাপানি সৈন্যরা সাইগনে প্রবেশ করে। এটি পূর্ব এশিয়ায় আরও আক্রমণের জন্য ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভিয়েতনামি কমিউনিস্টরা জাপানিদের প্রতিরোধ করতে মিত্রশক্তিকে সহযোগিতা করে। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে হো চি মিং− ভিয়েত মিনহ (ভিয়েতনাম স্বাধীনতা লীগ) প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর, দেশটিতে ভিয়েৎ মিং ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এই সময় এরা একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলে।

১৯৪৪-এর শেষে টাইফুন, বন্যা এবং খরা ফসল ধ্বংস করে। উত্তর ভিয়েতনামের রেড রিভার ডেল্টায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এছাড়া মার্কিন বিমান হামলায় পরিবহন ব্যবস্থা (রেল, রাস্তা) ধ্বংস হয়, যার ফলে দক্ষিণ থেকে উত্তরে চাল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
ভিচি ফ্রান্স (নাজি-নিয়ন্ত্রিত) এবং জাপানি সহযোগিতায় খাদ্য মজুতের অপব্যবহার হয়।
 
১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ৯ মার্চ  জাপান ফরাসি প্রশাসনকে উৎখাত করে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় ।   ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে জাপানের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ভিয়েৎনামে জাপানী দখলের অবসান ঘটে।

কিন্তু ভিয়েৎনামে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৯৪৫-এর স্বাধীনতা ঘোষণায় দুর্ভিক্ষে ২০ লক্ষ লোকের মৃত্যু হয় বলে জানান। আধুনিক গবেষণায় প্রায় ১০ লক্ষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করা হয়।

ভিয়েৎনাম কার্যত ১৯৪৫ খ্রিষ্তাব্দের ২রা সেপ্টেম্বর স্বাধীনতা লাভ করে। আর ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের মার্চে ভিয়েতনাম সরকারকে ফ্রান্স স্বীকৃতি দেয় এবং ফরাসি ইউনিয়নের অধীনে ভিয়েৎনামকে তারা মুক্ত দেশ হিসেবে মেনে নেয়। কিন্তু জুন মাসে ফ্রান্সের সাবেক রাজা বাও দাইকে রাষ্ট্রের প্রধান ঘোষণা করে। ফলে ভিয়েত মিনহ গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। দীর্ঘ নয় বছর যুদ্ধ করার পর, ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে দিয়েন বিয়েন ফু সামরিক ঘাঁটিতে, ফরাসি বাহিনীকে পরাজিত করে এবং ভিয়েত মিং চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হয়।

ইন্দোচীন যুদ্ধের শুরু
১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ ডিসেম্বর হো-চি-মিনের নেতৃত্ব হ্যানয়ে ভিয়েত মিনহের আক্রমণ শুরু হয়। ফরাসিরা হ্যানয় ও সাইগন দখল করে। ফলে ভিয়েত মিনহ উত্তরের জঙ্গলে পিছু হটে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। এই যুদ্ধে ফ্রেঞ্চ এক্সপিডিশনারি কর্পস (
CEFEO) – ইউরোপীয়, আফ্রিকান ও স্থানীয় সৈন্যসহ প্রায় ১৯০,০০০ অংশগ্রহণ করে। এছাড়া তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাহায্য পায়। অন্য দিকে জিয়াপের নেতৃত্বে গেরিলা যোদ্ধারা কৌশলের যুদ্ধে শুরু করে। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে চীনের কমিউনিস্ট বিজয়ের পর চীন থেকে তারা অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ পায়।

১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ মার্চ – ৭ মে-এর মধ্যে ভিয়েত মিনহের ৫০,০০০–৮০,০০০ সৈন্য, ফরাসি ১৩,০০০–১৬,০০০ সৈন্যকে ঘিরে ফেলে। জিয়াপ পাহাড়ে আর্টিলারি লুকিয়ে ফরাসি বিমানঘাঁটি ধ্বংস করে।  এই যুদ্ধে প্রায় ২,০০০ নিহত হয় এবং ১০,০০০–১২,০০০ বন্দি হয়। যদের অনেকেই  মার্চ মাসে মারা যায়।  এই যুদ্ধে ভিয়েৎ মিনহের ২০ থেকে ২৫ হাজার সৈন্য হতাহত হয়।

এই যুদ্ধের পর দিয়েন বিয়েন ফুর পর ফ্রান্সের জনমতে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন বাড়ে এবং তারা যুদ্ধ ছেড়ে দেয়।  ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে এপ্রিল জুলাই মাসে জেনেভাতে মীমাংশার জন্য ফ্রান্স, ভিয়েত মিনহ, চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য অংশগ্রহণ। সর্বসম্মতিৱক্রমে  ভিয়েতনামকে ১৭তম সমান্তরালে সাময়িকভাবে বিভক্ত করা হয় (উত্তর: ভিয়েত মিনহ, দক্ষিণ: ফরাসি-সমর্থিত সরকার)। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে এই বিষয়ের চূড়ান্ত মীমাংশার জন্য নির্বাচনের কথা ওঠে।  কিন্তু তা দক্ষিণ প্রত্যাখ্যান করে। এই সময় লাওস ও কম্বোডিয়া স্বাধীনতা লাভ করে।