দক্ষিণ ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতি
দক্ষিণ ভারতে প্রচলিত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের
ধারার সাধারণ নাম।
ভারত উপমহাদেশের ভৌগৌলিক অবস্থান সীমা হিসেবে উত্তরে মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা; পশ্চিমে আরব সাগর; পূর্বে বঙ্গোপসাগর; দক্ষিণে ভারত মহাসাগর।
এর রাজ্যগুলো হলো- অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক, কেরালা, তামিল নাড়ু এবং তেলেঙ্গেনা।
খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষার্ধে মুসলমান শাসনামলে- ভারতীয় শাস্ত্রীয়
সঙ্গীতের সাথে আরব্য-পারশ্যের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মিশ্রণে- ভারতীয় শাস্ত্রীয় একটি
বিশেষ রীতিতে বিকশিত হতে থাকে। এই সময় ভারতীয় শাস্ত্রীতের চিরায়ত ধারা বজায়
থাকে দক্ষিণ ভারতে। উত্তর ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ক্রমবিবর্তনের ধারায় যে
স্বতন্ত্র রূপ লাভ করে, তাই উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য
- সুরাঙ্গ:
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুরাঙ্গের ভিত্তি হলো রাগ। উত্তর ভারতে
রাগগুলোর চলন ধীরে ধীরে দক্ষিণী রাগগুলো থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া আরব
পারশ্যের রাগের সাথে ভারতীয় রাগের মিশ্রণে নতুন নতুন রাগের সৃষ্টি হয়েছিল।
মুসলান সঙ্গীত শিল্পীরা একাধিক রাগের সংমিশ্রণে নূতন রাগের সৃষ্টি হয়েছিল।
আঞ্চলিক সুরাবলম্বনেও কিছু নতুন রাগের সৃষ্টি হয়েছিল।
দক্ষিণ ভারতে প্রচলিত ধ্রুপদের মতো উত্তরা ভারতে ধ্রুপদ প্রচলিত ছিল। কিন্তু
খেয়াল বা খেয়ালাঙ্গের গান একমাত্র উত্তর ভারতেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। কালক্রমে
উত্তর ভারতে দরবারী গানের সূত্রে ঠুমরী এবং টপ্পার প্রচলন হয়েছে। আরব-পারশ্যের
গজলও উত্তর ভারতে নিজস্ব হয়ে উঠেছে ধীরে ধীরে। ভজনাঙ্গের গান দক্ষিণ ভারতেও ছিল,
তবে উত্তর ভারতের ভজনের চলন ভিন্নতর রূপ লাভ করেছিল।
- ঠাট: রাগের বর্গীকরণে ৭২টি মেল নির্ধারিত
হয়েছে। উত্তর ভারতে ১০টি ঠাট নির্ধারিত হয়েছে।
- তালাঙ্গ:
দক্ষিণ ভারতে শাস্ত্রীয় এবং লৌকিক গানের বিচারে ৩৫টি তাল গৃহীত হয়েছে। কিন্তু
উত্তর ভারতে তালের এরূপ কোনো সুনির্দিষ্টত গণ্ডিতে বাঁধা নেই। মাত্রাগত সংখ্যা
ও পদ সংখ্যার হেরফেরে বহু নতুন তাল তৈরি হয়েছে। শাস্ত্রীয় গানের পাশাপাশি লৌকিক
গানের তাল, উত্তর ভারতের সঙ্গীতের ধারায় যুক্ত হয়েছে। দক্ষিণের তালে ফাঁক বলে
কিছু নেই সবই তালি। উত্তরভারতের তালগুলোতে খালি বা ফাঁকের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
- বাদ্যযন্ত্র:
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের
ভিত্তি সুরযন্ত্র তানপুরা এবং বীণার ব্যবহার উভয় পদ্ধতিতেই ছিল। তালযন্ত্রের
ভিতরে সাধারণ যন্ত্র ছিল পাখোয়াজ, মন্দিরা। কিন্তু উত্তর ভারতে সেতার, সরোদ,
সারেঙ্গী, তবলা যেমন উত্তর ভারতের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র, দক্ষিণের নিজস্ব
বাদ্যযন্ত্র হিসেবে মৃদঙ্গমের উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে।
- নৃত্য: দক্ষিণের
ভরতনাট্যম এবং কথাকলি নিজস্ব বৃত্য ধারা থাকলেও কালক্রমে তার চর্চা উত্তর
ভারতেয় ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু উত্তর ভারতে কথক দক্ষিণে স্থান পায় নি। উড়িষ্যার
ওড়িষি নৃত্যও উত্তর ভারতে চর্চিত হয়ে থাকে সর্বাধিক। উত্তর-পূর্ব ভারতের মণিপুরী
নৃ্ত্য, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে স্থান করে নিয়েছে।
- ঘরানা: উত্তর ভারতে
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশেষ শৈলী তৈরি হয়েছিল ঘরানারা ধারা। রাগরূপায়ণে
বাদ্যযন্ত্রের বাদনশৈলী ঘরানা একটি ভিশিষ্ট স্থান দখল করেছিল দীর্ঘদিন ধরে।