মাইজভাণ্ডারী গান
বাংলাদেশের লোকসংগীতের সুফি-প্রভাবিত মরমী লোকগান
বিশেষ। এই গানগুলো মূলত ভক্তিরসে ভরপুর, যা ঈশ্বরপ্রেম, মানবতা, নৈতিকতা এবং অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা বহন করে। এর সুর সরল, ভাষা নির্মল এবং আঙ্গিক লোকসংগীতের মতোই মুখোমুখি প্রচারিত।
খ্রিষ্টীয় ১৯শ শতাব্দীর শেষভাগে চট্টগ্রাম জেলার
ফটিকছড়ি উপজেলার মাইজভাণ্ডার গ্রামের সৈয়দ আহমদুল্লাহ মাইজভাণ্ডারী
[গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী
]
এই গানের প্রবর্তন করেছিলেন। এই গ্রামের নামানুসারে এই লোকমুখে এই গান 'মাইজভাণ্ডারী গান'
নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে সময় তিনি লঘু নৃত্যগীতের সাধনার অংহগ হিসেবে যুক্ত
করেন।
মূলত ওরশ সমাবেশ এবং আধ্যাত্মিক মাহফিলে. ভক্তরা গাউসুল আজমের আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য ও মানবিক উদারতায় আকৃষ্ট হয়ে গান রচনা শুরু করেন।
প্রথম দিকে এগুলো রচিত হয়েছিল উর্দু গজলের মতো করে। পরে ধীরে ধীরে বাংলা লোকগানের
আদলে গানগুলো রচিত হতে থাকে। গাউসুল আজমের সময়ে এই গানগুলো তরিকার অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে।
মাইজভাণ্ডারী গানের আদি রচয়িতা ছিলেন আল্লামা সৈয়দ আব্দুল হাদী কাঞ্চনপুরী (রহঃ)।
তাঁর রচিত 'রত্ন সাগর' গ্রন্থে বেশ কিছু গান সংকলিত।
এরপর এই গান রচনা এবং পরিবেশনে বিশেষ কৃতইত্ব দেখান চট্টগ্রামের কবিয়াল রমেশ শীল। তাঁর
গানগুলো পাওয়া যায় নয় খণ্ডে প্রকাশিত গ্রন্থাবলিতে। গ্রন্থগুলো হলো- আশেকমালা, শান্তিভাণ্ডার, মুক্তির দরবার, নুরের দুনিয়া, জীবনসাথী, সত্যদর্পণ, ভাণ্ডারে মাওলা, মানব বন্ধু এবং ঈশকের সিরাজিয়া।
এছাড়া অন্যান্য যাঁর এই গান রচনা করে খ্যাতি লাভ করে করেছিলেন- এঁরা হলেন- আব্দুল গণি, বজলুল করিম, আব্দুল্লাহ, মাহবুব-উল আলম, আবদুল গফুর হালি।
১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে 'আঞ্জুমান-ই-মুত্তাবেয়ীন-ই-গাউস-ই-মাইজভাণ্ডারী' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গানগুলো সামাজিক সেবা ও অসাম্প্রদায়িকতা
ভাবনার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে।
মাইজভাণ্ডারি গান মূলত সুফি ও ভক্তিমূলক সংগীত। এর মধ্যে ইসলামী তাসাউফ, আল্লাহপ্রেম, নবীপ্রেম, পীরপ্রেম ও মানবপ্রেম প্রধান বিষয় হিসেবে প্রতিফলিত হয়।
এতে আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভক্তি,
মাইজভাণ্ডার দরবারের পীরগণের প্রশংসা ও স্মরণ,
মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
এই গানে সাধারণত বাংলার লোক-বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়। যেমনে একতারা, দোতারা, ঢোল, বাঁশি, তবলা।
বর্তমানে এই গানে হারমোনিয়ামের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।