প্যাগান সঙ্গীত
সঙ্গীতশাস্ত্রের একটি পারিভাষিক শব্দ।
প্যাগান শব্দটির মূলে রয়েছে লাতিন pagus শব্দটি এর অর্থ ছিল গ্রাম বা গ্রামীণ এলাকা।
এই শব্দ থেকে
লাতিন paganus
।
এর প্রাথমিক অর্থ ছিল গ্রামবাসী। পরে এই শব্দটি ব্যবহৃত
হয়েছে- গ্রাম্য, লোকায়ত,
গ্রামীণ মানুষ ইত্যাদি অর্থে। কখনো কখনো সৈন্যদের ভাষায়
'অদক্ষ সৈনিক' বা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো।
খ্রিষ্টধর্মের উত্থানের পর ৩য়-৪র্থ শতাব্দীতে ক্রমে ক্রমে লাতিন ভাষাভাষীদের শহরাঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে প্রাচীন বহুদেববাদী ধর্ম ও ঐতিহ্য বেশি টিকে ছিল।
সে সময়ে তাই শহুরে খ্রিষ্টানরা
paganus শব্দটিকে অবজ্ঞাসূচকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে।
তখন খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে নি তাদের গোষ্ঠী হিসেবে বুঝানোর জন্য এই শব্তটি
ব্যবহার করতো। বোঝাতে। এটি ধীরে ধীরে 'পৌত্তলিক' বা 'অখ্রিষ্টীয়' অর্থে পরিণত হয়। পরবর্তী
সময়ে পরে এটি খ্রিষ্টধর্ম, ইহুদি ধর্ম এবং ইসলাম ধর্মের বাইরের ধর্মবিশ্বাস বোঝাতে ব্যবহৃত হওয়া
শুরু হয়। তবে ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রে 'প্যাগান' শব্দটি ততটা সরাসরি ব্যবহৃত হয় না। ইসলামে
অন্য ধর্মাবলম্বীদের সাধারণত 'মুশরিক' বা 'কাফির' শব্দ ব্যবহৃত হয়। তবে আধুনিক আলোচনায়
আব্রাহামীয় ধর্মের (খ্রিষ্ট, ইহুদি, ইসলাম) বাইরের প্রকৃতি-কেন্দ্রিক বা বহুদেববাদী ধর্মকে
'প্যাগান' বলা হয়।
এই বিচারে
প্যাগান সঙ্গীত হলো
বহু-ঈশ্বরবাদী পৌত্তালিক ধর্ম সঙ্গীত। প্রাচীন প্যাগান সমাজে (গ্রিক, রোমান, কেল্টিক, নর্ডিক ইত্যাদি) সঙ্গীত প্রায়ই দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হত।
যেমন বলি, উৎসব, আচার বা প্রার্থনার সময় এই সঙ্গীতের ব্যবহার ছিল। প্রাক-খ্রিষষ্টীয় যুগের (প্রায় ৪র্থ শতাব্দী পর্যন্ত) বিভিন্ন পৌত্তলিক সংস্কৃতির গান, চ্যান্ট, যন্ত্রসঙ্গীত
প্রচলিত ছিল। এ গানগুলো দেবতা, প্রকৃতি, উৎসব ও আচারের সাথে যুক্ত ছিল। এগুলোর খুব কমই লিখিত আকারে টিকে আছে।
খ্রিষ্টীয় ২০শ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ (১৯৭০-এর দশকে) নব্য প্যাগনিজম আন্দোলনের সাথে যুক্ত শিল্পীরা প্রাচীন পুরাণ, দেব-দেবী, ঋতু ও প্রকৃতিকে
উপজীব্য বিষয় ধরে নতুন গান তৈরি করেন। এগুলো বলা নব্য প্যাগান সঙ্গীত।
প্রাক্-খ্রিষ্টীয় কালে গ্রিক-রোমান পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে সৃষ্ট পুতুল পুজারীদের
দ্বারা প্যাগান গানের চর্চা ছিল সমগ্র ইউরোপ জুড়ে। এদের সঙ্গীতে ছিল দেবতার
উদ্দেশ্যে নিজেকে উৎসর্গ করার অঙ্গীকার। ইউরোপে দলগতভাবে টানা সুরে পরম ভক্তিতে
প্যাগন গান পরিবেশন করা হতো। ইউরোপে খ্রিষ্টাধর্মের বিকাশের কালে গির্জায় প্যাগান
সঙ্গীতের আদলে খ্রিষ্টীয় গানের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। চার্চের এই সঙ্গীতের উৎপত্তি
হলেও- শুধু ধর্মীয় দর্শনের বিচারে প্যাগন সঙ্গীতকে পৃথক গান হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়।
গানের বিষয়াঙ্গ
- প্রকৃতি বন্দনা: পৃথিবী, ঋতুচক্র, এবং মহাবিশ্বের উপাদানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা।
- প্রাচীন দেব-দেবী: গ্রিক, নর্ডিক, কেল্টিক বা মিশরীয় পুরাণের দেব-দেবীদের নিয়ে রচিত স্তব বা আখ্যান।
- আধ্যাত্মিকতা ও জাদুবিদ্যা: উইকা বা শামানিক রীতিনীতি সংক্রান্ত বিষয়।
প্রাচীন গ্রিক প্যাগান সঙ্গীত: প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার (প্রায় ৮০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৪র্থ শতাব্দী খ্রিষ্টাব্দ)
একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্রিকরা সঙ্গীতকে দেবতাদের উপহার মনে করতেন এবং এটি ধর্মীয়
আচার, উৎসব, থিয়েটার, বলি, বিবাহ, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং দৈনন্দিন জীবনের সাথে
গভীরভাবে জড়িত ছিল। সঙ্গীতের ধর্মীয় গুরুত্ব দেবতাদের সাথে
যুক্ত ছিল বলে- সঙ্গীতকে তারা স্বর্গীয় বলে মনে করা হত। এটি দেবতাদের প্রশংসা, প্রার্থনা এবং আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হত।
সে সময়ে সঙ্গীতের সাথে দেবতারা ছিলেন-
- অ্যাপোলো: সঙ্গীত, কবিতা ও সুরেলা সঙ্গীতের প্রধান দেবতা। তাঁর প্রধান যন্ত্র ছিল
বীণা।
- ডায়োনিসাস: মদ, উন্মাদনা ও উৎসবের দেবতা। তাঁর আচারে অউলোস (ডবল
রিড পাইপ) ব্যবহার হতো।
- মিউজ: ৯ জন দেবী, যাঁরা কবিতা, সঙ্গীত, নাচ ও বিভিন্ন শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করতেন।
- অন্যান্য:
- হার্মিস। এঁকে বীণাএ
আবিষ্কাক মনে করা হয়। অন্য দিকে অ্যাথেনা অউলোস, প্যান ফ্লুট
তৈরি করেছিলেন।
সসে সময়ে বলি, উৎসব, এবং ভবিষ্যদ্বাণী'র সময়
সঙ্গীত ব্যবহৃত হত।
- প্রধান যন্ত্রসমূহ
- ততযন্ত্র: ছোটো আকারের বীণা, হার্প, কিথারা
- বায়ু যন্ত্র:
Aulos (ডবল ফ্লুট),
কার্নিক্স, প্যান্ পাইপ, শঙ্খ ও হাড়ের বাঁশি, পশুর শিং (কর্নু)।
তালযন্ত্র:
ফ্রেম ড্রাম, সিস্ট্রাম, সিম্বল, পাথরের লিথোফোন।
সঙ্গীতের ধরন:
- হিমন ও প্যান: দেবতাদের উদ্দেশ্যে গাওয়া গান।
- থিয়েটারে:
রঙ্গরসাত্মক গো বেদনা-সূচক সম্মেলক গান পরিবেশিত
হতো।